“মিস ফরচুন নেভার কামস অ্যালোন।” গত শতাব্দীতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটি আত্মজীবনী পড়েছিলাম। সেখানে টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ পুপুল জয়কার বলেছিলেন “দুঃখ এমন এক জিনিস, যাকে কম্বলের মতো মুড়িয়ে রাখা যায় না।” জীবনের বহু মুহূর্তে এই কথাটি আমাকে সত্য বলে মনে হয়েছে। সেদিন চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। পরিবারে একের পর এক স্বাস্থ্য সংকট হাসপাতাল আর বাসার মাঝে দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত। বিপর্যস্ত আমি। রাত নামছিল, তরুণ রাত, গভীর, গাঢ় শোকের মতো অন্ধকার। ঠিক সেই সময় ফোন এলো। আমার স্ত্রী বলল “এমরান স্ট্রোক করেছে।” উইকেন্ডের সেই মুহূর্তে বয়সী নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছিলাম।
পরে এমরান চৌধুরীর শোকসভায় আমি এ কথাই বলেছিলাম। আমার বাবা আমাকে প্রায়ই বলতেন,“অ পুত, আমি মরবার আগে তো তুমি পুরো কোরআন শেষ করতে পারবা না। অন্তত ইয়াসিন সূরাটা শেষ করো যাতে আমার কবরে পড়তে পারো।” আমি তা করেছি। এর ফলে আমি ইয়াসিন সূরা আংশিক পড়লাম। সঙ্গে পড়লাম দোয়া ইউনুস-“লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।” এই দোয়াগুলো পড়ে খুব ধীর পায়ে মেট্রোপলিটন হাসপাতালের এইচডিইউতে গেলাম। রুমের ভেতর এমরান চৌধুরীকে দেখলাম নিস্তব্ধ, নীরব। এমরান চৌধুরী ও নারীনেত্রী প্রজ্ঞালোক প্রকাশনার কর্ণধার রেহানা চৌধুরী আমার ভাই ও বোন। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর বড় একটি অংশ তা জানত না। এমরানের মৃত্যুর কিছুদিন আগে রেহানা চৌধুরীর সংবর্ধনার সভায় বিষয়টি উঠে আসে। এমরান চৌধুরীর প্রথম জানাজা, শোকসভা, বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের সামনে চলে আসে। মৃত্যুর পরের সময়গুলো–লাশ ধৌতকরণ, প্রথম জানাজা–এই ক্রাইসিস মোমেন্টগুলো আমাকে শক্ত থাকতে বাধ্য করেছে। আমি নিজেকে খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ বলে জানি, মৃত্তিকার মতো নরম। কিন্তু সে সময় আমাকে দৃঢ় হতে হয়েছে।
প্রথম জানাজায় দেখেছি–ফ্রিজারে তাঁর গাড়ির পাশে মানুষের ভিড়, আমাদের পরিবার ও ভক্ত নারীস্বজনদের কান্নাভেজা উপস্থিতি। ময়মনসিং থেকে মাহজাবীন চৌধুরী নামে এক কিশোরী আমাকে লিখলেন স্যোশাল মিডিয়ায় “তার টিফিনের পয়সা জমিয়ে এমরান চৌধুরীর জন্য ঈদের পাঞ্জাবী পাঠিয়েছে।” রাশেদ রউফ সবসময় এমরান সম্পর্কে গুড মাউথিং করতো। সিনিয়র বলে সম্মান করতো। মৃত্যুর একদিন পর রাশেদ রউফ একটি শোকসভা আয়োজন করেন। সেখানে আমি বক্তব্য রাখি। এরপর গ্রামে আরেকটি শোকসভা হয়। গ্রামে এমরান খুব পরিচিত ছিলেন না। তবে আমার বাবা ফোরক মাস্টার গত শতাব্দীর একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে মানুষের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। হয়তো সেই সূত্রে, কিংবা বরমা কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রিন্সিপাল হিসেবে আমার পরিচয়ের কারণে, তাঁর গ্রামের জানাজাতেও মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ, জানাযা, শোক সভা সমূহের সংবাদ জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, স্যোশাল মিডিয়ায় সয়লাব হয়ে গেছে। তার উপর স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তৃতীয় শোকসভার আয়োজন করেন হৃদয় হাসান বাবু, জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামে। সেখানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। তাতে আমাদের পারিবারিক জীবন বৃত্তান্ত উঠে আসে আমরা মোটামুটি দশ ভাইবোন ছিলাম। “গুন্ডুইল্লা” উপন্যাসে তার বর্ণনা রয়েছে। আমার তিনজন ভাই মারা গেছেন। আমার একজন ভাই আমার মায়ের খালার বাড়ির বরকল এ পুকুরে ডুবে মারা যায়। আরেকজন মহসিন, চট্টগ্রামে যখন আমার মা বাকলিয়ায় বাংলাদেশের বুখারী শরীফের শীর্ষ ওস্তাদ দেওবন্দী গ্রাজুয়েট মাওলানা মাসউদ উল হকের মৌলভী কলোনীতে বেড়াতে এসে ডায়রিয়ায় মারা যান, মিয়াখান নগরে তাকে দাফন করা হয়। এই ছিন্নমুকুল আমার তরুণ জীবন পর্যন্ত বিষাদময় করে রেখেছিল।
এমরানুল হক চৌধুরী (এমরান চৌধুরী) জন্মগ্রহণ করে ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৭ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে দোভাষীদের লঞ্চে করে আমরা দুই ভাই চট্টগ্রাম শহরে চলে আসি। এমরান চৌধুরী নাগরিক এই জীবনকে গ্রহণ করতে পারেনি। ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো সে ছটফট করেছে। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ একবার যাকে গ্রাস করে সে আর ফিরে যেতে পারে না। আমাদের একটি সামন্ত স্নেহময় একান্নবর্তী পরিবার পুনর্বার ফিরে পাওয়া দরকার। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় কে এম ওয়াই জুনিয়র হাই স্কুল, কদম মোবারক মিউনিসিপ্যাল স্কুল এরপর মুসলিম হাই স্কুল এবং সিটি কলেজ থেকে তিনি কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন, উভয় পরীক্ষাই কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে।
কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য বিভাগে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাঁচলাইশ, আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কাজ করেছেন। তার সরকারি চাকরিতে যোগদান ৩০ জুন ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে। দায়িত্বশীল, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবেই সে পরিচিত ছিলো। গত শতাব্দিতে চন্দনাইশের হাশীমপুরে (চট্টগ্রামস্থ কাজীর দেউড়ীর বংশধর) গিয়াস চৌধুরীর কন্যা ফাতেমা টকিকে বিয়ে করে। করোনাকালীন ফাতেমা টকি ইন্তেকাল করেন। এমরান হয়ে উঠেছিল ভাই–বোন, আত্মীয়–স্বজনদের একধরনের গার্ডিয়ান।
আমরা মুদ্রাহীন ছিলাম, কিন্তু ইউনিফাইড ছিলাম না। ব্যক্তিগতভাবে আমরা সবাই নিরন্তর সংগ্রামী। আমাদের জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা বা প্রিভিলেজ খুব বেশি ছিল না। আমি ট্রেডবডিতে, কর্পোরেট হাউস, কলেজ, মাদ্রাসা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা সহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি, কিছু কমেপ্রামাইজও করেছি। কিন্তু এমরান কখনো কমেপ্রামাইজ করেনি।
আমাদের বড় ভাই আবুল ফাত্তাহ মুহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন চৌধুরী মন্টু রাঙ্গামাটিতে থাকতেন। সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী আমাদের পরিবারের নামকরণ, কৃষ্টি এইসব খুব পছন্দ করতেন। আমার ডাক নাম খোকন, আমাদের সবার ছোট ভাই এর নাম হচ্ছে রিজওয়ানুল হক চৌধুরী মিঠু। রাঙ্গামাটিতে একবার রমজানে মা বললেন, সেহরির বাজার করে আনতে। কিন্তু বড় ভাই বাজার না করে আমাদের নিয়ে কাঠের তৈরি ইন্দ্রপুরী সিনেমা হলে নিয়ে গেলেন রাজ্জাক অভিনীত প্রথম ছবি “বেহুলা” দেখাতে। এই রূপালী পর্দা দর্শন আমার জীবনে একটা স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলো এই ঘটনাটা বলি শুধু বোঝাতে আমরা কতটা ফ্রেন্ডলি ছিলাম। এমরান সহ আমরা হাটহাজারী হেলথ কমপ্লেক্স, মোহাম্মদপুর, মনু মিয়াজী লেইন, সিরাজদ্দৌলা রোডে একসাথে ছিলাম। পরে এমরান আলাদা ব্যাচেলার লাইফ লিড করতো। গত শতাব্দিতে তার হার্ট এ একটি সার্জারির জন্য কোলকাতায় গিয়েছিল। তার প্লেন যখন আকাশে উড়ল, তখন আমি অঝোরে কাঁদছিলাম।
১৯৭৯–৮০ সালের দিকে, যখন আমার লেখার বয়স আট–দশ বছর, দেখি এমরান নিয়মিত ডায়েরি লিখছে। তখন ভাবিনি সে একদিন বড় মাপের লেখক হবে। পরবর্তীতে সে তৃণমূল সংগঠনে যুক্ত হয়, সংগঠন গড়ে তোলে, লেখালেখি করে। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে কিশোর আত্মজীবনী “গুন্ডুইল্লা” যেখানে আমাদের বুবুর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। বুবুর সামন্ত ঘরে বিয়ে হয়। সেখানে একবার বেড়াতে যাওয়ার সময় সে আমি, আমাদের কাজিন প্রায় সবার জুতা–স্যান্ডেল কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এটা তাঁর সরলতা না বোকামি আজও বুঝে উঠতে পারি না। “গুন্ডুইল্লা” থেকে দুটো উদাহরণ দিচ্ছি
১। “গুরু বা’জান ছিলেন সাত গেরামের মাস্টার। তিনি হাজী মহসিনের মতো কোনো দানবীর ছিলেন না। ছিলেন না বিদ্যাসাগরের মতো কোনো বিদ্বান। তিনি ইউনিয়ন কাউন্সিলের জাঁদরেল প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। তবু তাকে অনেক অনেক লোক চিনত আর জানতো। কেন? চেনার একটাই কারণ ছিল, তিনি সাত গেরামের অন্ধকারের ফাঁক ফোকরে ঢুকে আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন। তিনি আলো ফেরি করে বেড়িয়েছেন শেষ সময় অবধি।
২। গুরু বা‘জান মারা যাওয়ার খানিকটা আগে দুজনকে কাছে ডেকেছিলেন। একজন গুরু মা, অন্যজন গুরু খালু। তাঁর একটিমাত্র ছেলে। বা’জান তাঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে মেজ ছেলের চোখে তাঁর ভবিষ্যত দেখতে পেয়েছিলেন। তাই খালুজানকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, ‘তমালের বাপ, তোর কাছে আঁর চঅনের কিছু নেই। শুধু একটি অনুরোধ তুই তোর ছেলের জন্যে মাস্টার রাইলে আঁর রোকন অরেও একটু পড়তে দিস।’ আর মা–কে কাছে ডেকে কম্পমান গলায় বলেছিলেন, ‘আঁই তোরে এক ওইজ্জাঁ পোয়া মাইয়া দি যাইর কিন্তু একখানা ওইজ্জাঁও দি যাইর ন পাইলাম।’ এখানে রোকন চরিত্রটা হচ্ছে আমি।
২০২৫ সালে লিডিং পাবলিশিং হাউস থেকে আমার আত্মজীবনী “আমি অকৃতী অধম” প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পায়। কিন্তু আমি অকপটে বলি এমরান চৌধুরীর “গুন্ডুইল্লা” (২০২৩) আমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি পলিটিক্স করতাম। মার্কসিজমে বিশ্বাস করতাম। এমরান ফান্ডোস ছিল না। ৭১‘ কে ধারণ করা তাঁর লেখার মধ্যে রয়েছে। এই শতাব্দিতে বাংলাদেশে শহীদ আখন্দ, মুস্তফা জামান আব্বাসী, আল মাহমুদসহ অনেকে কোরআন– হাদীস ও নবী– রসুলের উপর লিখেছেন।
অনুরূপভাবে গল্পে গল্পে মহানবী (সা.), ফেল করা ছেলেটি, ছোটদের নবী ও রাসুল, গল্পে গল্পে হযরত আবু বকর (রা.), গল্পে গল্পে হযরত ওমর (রা.), গল্পে গল্পে হযরত ওসমান (রা.), গল্পে গল্পে হযরত আলি (রা.) এসব গ্রন্থ এমরান রচনা করেছেন। তাছাড়া স্থানীয় দৈনিক ও মাসিক তরজুমানে মুসলিম মনীষী ও বিজ্ঞানীদের উপর লেখালেখি করতেন।
এমরান চৌধুরী প্রজ্ঞালোক প্রকাশন চট্টগ্রাম থেকে “যুগের প্রতীক মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী” প্রকাশ করে। ঢাকার এ্যডর্ন পাবলিশার্স রচিত হতাশ জীবন: মাওলানা মনিুরুজ্জামান এছলামাবাদী একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। আমি কর্পোরেট চাকরি বেছে নিয়েছিলাম। সে সরকারি মিডলেবেল এ কাজ করেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ফুলটাইম লেখক হওয়ার জন্য সে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেয়। আজ যখন তার কবর জিয়ারত করতে যাই, মনে হয় আরও জড়িয়ে ধরতে পারতাম, আরও কথা বলতে পারতাম। ওর মধ্যে যেমন অভিমান ছিল, এখন আমার ভেতরেও তীব্র হাহাকার বইছে। আমি ১৯৬৪ সালে বাবা হারিয়েছি, ১৯৭২ সালে মা হারিয়েছি। পরে দুটো পুত্র হারিয়েছি। বড় ভাই ও বড় বুবুসহ আরও বহু স্বজন হারিয়েছি। আমার একটি বইয়ের নাম “পৃথিবীর করুণ ডাঙায়” সম্ভবত সেটাই আমার জীবনের সারকথা। যা কিছু অর্জন করেছি, সবই শ্রমে, ঘামে, রক্তে। উই আর নট প্রিভিলেজড, নট প্রটেকটেড, নট প্রোমোটেড। মানুষ আমাদের অবহেলা করেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু তাতে আমরা থামিনি। এমরান চৌধুরীর মৃত্যু আমাদের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে দিয়েছে। রফিক আজাদ বা শহীদ কাদরীর একটা কবিতায়, “গভীর নিশীথে উঁচু পাহাড় থেকে পতনের এক শব্দ ভাই–ই–ই” এই হাহাকার বুকে বাজে। ১২ জানুয়ারি তাঁর চল্লিশায় গ্রামের বাড়িতে গেলাম সব কিছু যেন অচেনা, কুয়াশা, কুয়াশা লাগছে। গালিব বলেছেন এক টুকরো কাফনের জন্য মানুষের দীর্ঘ পদযাত্রা। তাছাড়া বারবার মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের “এ জীবন যত বড়ো, তত শূন্য, তত অর্থহীন।”
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, পরিচালক– থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম।











