জন্মের সাথেই মৃত্যু সম্পৃক্ত অনিবার্যভাবে। কবিও বলেছেন একই কথা কবিতার ছন্দে: জন্মিলে,মরিতে হবে,অমর কে কোথা রবে? এরপরেও কিছু প্রিয়জনের মৃত্যু যখন একেবারে আসে হঠাৎ নীরবে নিভৃতে, তা মেনে নেয়া কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। গত রবিবার সকাল ১১ টা নাগাদ যখন শুনলাম আমাদের সকলের প্রিয় জিনাত আপা আর নেই, অবাক হয়ে গেলাম। কারণ একজন মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকলে আমরা শুনে উনার আরোগ্য কামনা করি। জিনাত আজম গুরুতর অসুস্থ হতেন যদি, আমরা সে খবর পেতাম, এবং উনাকে নিয়ে চিন্তিত হতাম। ফলে সেদিন আমার হাজবেন্ড যখন আমাকে উনার মৃত্যু সংবাদ দিলেন, আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ফেসবুকে এসে দেখি রাশেদ রউফের পোস্ট, আরো অনেকের পোস্ট। ফোন লিস্টে দেখি রুনু বিলকিস আপার ফোন। তাই রুনু আপাকে ফোন দিলাম। আপা জানালেন, তিনি ভালো মানুষ। রাতে ডিনার করেছেন একসাথে। এরপর ঘুমাতে গেলেন। সকালের খাবারের জন্য জন্য ডাকতে গিয়ে দেখেন, তিনি তখন চিরনিদ্রার দেশে! কি সুন্দর আর শান্তির বিদায়। কাউকে কষ্ট না দিয়ে, বিছানায় ধুঁকে ধুঁকে না কাতরিয়ে ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
জিনাত আজম চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাবের নেত্রী। তিনি সম্পর্কে আমার নানী। মানে আমার মেজোমামী (নীলু)-এর মেজোমামী। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়িয়ে উনার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক কমপক্ষে ৪০ বছরের। আমি ৮৫ সালে শ্রদ্ধেয় ফাহমিদা আপার মাধ্যমে জিনাত আপার সাথে পরিচিত হই। বিশেষ করে লেডিস ক্লাবের নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ফাহমিদা আপা লেডিস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ৮৫ সালের মার্চে নারী দিবসে আমি রেডিওতে ফাহমিদা আপার সাথে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। আপার সাথে আমার শ্বশুর পরিবারের পারিবারিক সম্পর্ক। আপা তখন আজাদীর মহিলা মাহ্ফিল দেখতেন। ৮৫–এর শেষের দিকে পূর্বকোণ প্রকাশের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আমরা কাজে যোগ দেয়ার অপেক্ষায়। ৮৬–এর ফেব্রুয়ারিতে পূর্বকোণ প্রকাশিত হলো। ফাহমিদা আপা তখন থেকেই পূর্বকোণের লেখক হয়ে গেলেন। সাথে আরো লেখিকা পেলাম। ফেরদৌস আরা আলীম, ফেরদৌস আরা কবির, আরো পরে আনোয়ারা আলম, সালমা চৌধুরী, রুনু সিদ্দিকী, ফজিলতুল কদর প্রমুখ লিখতেন পূর্বকোণে। আমি সাংবাদিকতায় যুক্ত হবার সুবাদে লেডিস ক্লাবের সব প্রোগ্রামে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হতাম। জিনাত আপা, খালেদা আউয়াল আপারা তখন অনেক কম বয়সের। খুবই ফ্যাশন সচেতন ছিলেন। খুব সুন্দর করে সাজতেন। এমনিতেই সুন্দরী, তার উপরে উন্নত রুচির গেটআপ! আমাকে মুগ্ধ করতো। আমি অবাক হয়ে যেতাম উনাদের অনুষ্ঠানে গিয়ে। একবার বিশ্বকাপ ফুটবলে বিশেষ সংখ্যা বের করা হবে। আমাকে কিছু মহিলার বিশ্বকাপ প্রতিক্রিয়া নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হলো। সেই লিস্টে জোবাইদা চৌধুরী ( লিভার ব্রাদার্স–এর আলী আকবর চৌধুরীর স্ত্রী, তিনি অনেক আগেই প্রয়াত), নাজনীন আহমেদ, (তিনিও প্রয়াত) জিনাত আজমসহ আরো কয়েকজন ছিলেন। তো আমি ল্যান্ডফোনে জিনাত আপার সাথে যোগাযোগ করেই উনার ও আর নিজাম রোডের বাসায় যাই। আজম সাহেব ছিলেন বাসায়। তিনি এই শহরে প্রথম নারী সাংবাদিক দেখে উচ্ছ্বসিত হলেন, জিনাত আপাকে বললেন, তোমরা তো নারীদেরকে সংবর্ধনা দাও, নারী সাংবাদিককে কখন দেবে? জিনাত আপার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর ছিল অত্যন্ত চমৎকার। আমার স্পষ্ট মনে আছে,আপা মিষ্টি হেসেই বলেছেন, দেবো অবশ্যই দেবো, তবে এখন নয়, আমার নাতিনের কপালে চুলগুলো একটু সাদা হয়ে চিকচিক করুক, তখন দেবো। ২০১৪ সালে আমাকে লেডিস ক্লাব নারী সাংবাদিক হিসেবে সংবর্ধিত করে। কেবল সংবর্ধনা দিয়েই শেষ নয়, আমাকে অনারারি সদস্য পদ দিয়েও সম্মানিত করেছেন। কত শত অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিয়েছি বলে শেষ করতে পারবো না। অনেক উপভোগ করেছি। কত জনের সান্নিধ্য পেয়েছি! এসব সম্ভব হয়েছিল ফাহমিদা আপা, খালেদা আপা আর জিনাত আজমদের মতো গুণী ও সত্যিকারের লিডারশিপ প্রদানকারী নারীরা ছিলেন বলেই। জিনাত আপা আমাকে কত কত ফোন করতেন। কি সুন্দর আর আন্তরিক ছিল তাঁর সম্ভাষণ। বেশিরভাগ ফোন ছিল ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেয়ার জন্য। মাসিক পার্টিতে সেকি আয়োজন! ক্লাব মেম্বারদের রান্না করা পদের পদের খাবার। এছাড়া পিকনিক, বার্ষিক এজিএম উপলক্ষে আয়োজন হতো। সব অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রিত হতাম। ক্লাবের জিনাত আপা আর খালেদা আপা যেন হরিহর আত্মা। দুজনেই বান্ধবী। খালেদা আপার ডাক নাম কাজল, আর জিনাত আপার নাম চুনচুন। জিনাত আপা নিজেই আমার সাথে গল্প করতেই করতেই এসব বলতেন। একদিন ছেলের বউ মুনমুনের কথা বলতেই বলেন, জানো ওর সাথে আমার অনেক মিল! ওর নাম মুনমুন,আমার নাম চুনচুন। আমিও নাচ করতাম, সেও নাচ জানে। আর কত প্রশংসা করতেন মুনমুনের। মুনমুন আমার মেয়েতুল্য। আলোকচিত্রী তওফিক ভাইয়ের মেয়ে। আর মুনমুনের স্বামী উনার ছেলে আতিক একজন মানবিক মানুষ। ছেলে যেনো মায়েরই প্রতিমূর্তি! এমন সন্তান রেখে যাওয়াও এক সৌভাগ্য বলতে হবে। যোগ্য মায়ের যোগ্য ছেলে। মানবিকতার শিক্ষা তো মায়ের থেকেই পেয়েছে। আপা নিজেই নীরবে নানা মানবিক কাজ করতেন। বিশেষ করে নারীদের এগিয়ে নিতে, নারীদের নানা সমস্যা, সংকট থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিতেন, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া নারীদের সাহস যুগিয়েছিলেন। সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন। সমাজসেবার পাশাপাশি লেখালেখি করেছেন। লেডিস ক্লাব আর লেখিকা সংঘের কাজে সদা নিয়োজিত থাকতেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও নাকি লেডিস ক্লাবে কোরবানীর দাওয়াত খাইয়েছিলেন বললেন রুনু বিলকিস আপা। আমার সাথে উনার শেষ দেখা ছিল বেশ আগে ক্লাবেরই এক অনুষ্ঠানে। উনি হাঁটতেন খুব ধীরে ধীরে। পরে সেদিন আনোয়ারা আপা থেকে শুনলাম, তিনি নাকি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। এরপরেও কাজ করতেন। আর গত শনিবার রাতে তিনি ডিনার করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, সেই ঘুমের মাঝেই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে, একেবারে নিঃশব্দে। মাত্র ৭৩ বছর! বার্ধক্য তো অনেক দূরে ছিল! আরো কিছুদিন তো থাকতে পারতেন। আসলে তিনিই জানেন, যিনি নিয়ে গেলেন। আপা,আপনার এই আকস্মিক যাওয়া সত্যিই অবিশ্বাস্য। যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন আপা।