১৭ই জানুয়ারি ২০২৬।
অন্যান্য দিনের মতো দিনের শুরু হলেও এ দিনটি আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে বিশেষ ও ভিন্ন আঙ্গিকে। আনন্দ উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরা সবাই সমবেত হয়েছি ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী আমাদের প্রিয় দৌলতপুর এ.বি.সি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এখানে অনুষ্ঠিত হলো বিদ্যালয়ের ৬৩ বছরের ইতিহাসের প্রথম পুনর্মিলনী। সকাল থেকেই প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিলো পুরো স্কুল এলাকা। দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য এই উৎসবের সূচনা হয় ভাব–গাম্ভীর্য পরিবেশের মধ্য দিয়ে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল বারী চৌধুরীর কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রম। এরপর বের করা হয় বর্ণাঢ্য এক আনন্দ র্যালি। নানান রঙের ব্যানার, বিভিন্ন ব্যাচ ভিত্তিক প্লেকার্ড হাতে নিয়ে একই কালারের টি–শার্ট পরে দলে দলে হেঁটে আনন্দ উচ্ছ্বাসের সাথে ব্যান্ড পার্টির সুরের মূর্ছনায় নেচে গেয়ে পুরনো স্কুলের সামনে দিয়ে প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে পুকুরপাড় হয়ে জনতা ক্লাবের সামনের রাস্তা ধরে ঘুরে এসে র্যালি শেষ হয় স্কুল প্রাঙ্গনে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আনন্দ হাসির মাধ্যমে র্যালি পরিণত হয় অপূর্ব এক শোভাযাত্রায়। এরপর জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। অতঃপর শান্তির পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করা হয়।
১৯৬৫ থেকে শুরু করে ২০২৫ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যাচের জন্য স্কুলের বিশাল মাঠে আলাদা করে বুথ তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান ট্রেন্ড অনুযায়ী ফটো তোলার জন্য ফুল দিয়ে খুব সুন্দর ডেকোরেট করে তৈরি করা হয়েছে অনেকগুলো ফটো তোলার স্পেস। র্যালি শেষে সবাই নির্ধারিত বুথে এসে সকালের নাস্তা পর্ব সেরেছে। সাথে সাথে শুরু হয় শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন। প্রাক্তন সকল শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক। এর পরপরই পুনর্মিলনী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘এবিসিয়ান’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর দলে দলে প্রত্যেক ব্যাচ অনেকটা শোডাউন এর মতোই স্টেজে উঠে ফটোসেশন করেছে একই সাথে প্রত্যেক ব্যাচের একজন খুব সংক্ষিপ্ত আকারে স্মৃতিচারণ করেছে। এই ব্যাপারটা ভীষণ উপভোগ্য ছিলো। কোনো ধরনের রিহার্সেল ছাড়াই একের পর এক ব্যাচভিত্তিক দল সময় ক্ষেপণ না করেই দ্রুততার সাথে ব্যানার এবং প্লেকার্ড হাতে নিয়ে স্টেজে উঠে নিজেদের পরিচয় পর্ব সারার পাশাপাশি স্মৃতিচারণ করেছে এবং ফটোসেশনে অংশ নিয়েছে। খুবই কম সময়ের মধ্যে প্রায় ৫৮ টা দল এই পর্বে অংশগ্রহণ করেছে। লাঞ্চের আয়োজন ছিলো মনে রাখার মতো। প্রত্যেকটা ব্যাচের বুথগুলোতে ব্যাচের প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে প্যাকেট লাঞ্চ ভ্যানে করে পৌঁছে দেয়া হলো। সবাই যার যার মতো চেয়ার টেবিলে বসেই কিংবা হাতে নিয়ে আনন্দের মধ্য দিয়ে লাঞ্চ শেষ করলো। প্রত্যেকে নিজেদের বুথগুলো যাতে অপরিষ্কার না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখছিলো। এ ব্যাপারে সবাই সচেতন ছিলো। এরপর সবাই দলে দলে যার যার ব্যাচ নিয়ে পুরো মাঠ জুড়ে ফটো তোলার স্পেস গুলোতে কিংবা স্টেজে ওঠে ছবি তুলছিলো। তিনটার পরেই শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশবরেণ্য সংগীত শিল্পীদের সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ হয় হাজারো দর্শক, শিক্ষক,শিক্ষার্থী এবং আগত অতিথিরা।
নামাজের বিরতিতে আবার সবাই দলবেঁধে চা কপি ফুচকায় মজেছিলো। এই মিলনমেলা শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান ছিলো না এটি এমন আবেগঘন মুহূর্ত ছিলো যেখানে প্রত্যেক এবিসিয়ান ফিরে গেছে শৈশবের নির্ভেজাল আনন্দে। এ মিলনমেলায় ছিলো না কোনো ভেদাভেদ। উপস্থিত সকলেই আনন্দ হাসি আড্ডায় আর স্মৃতিচারণে মুখরিত ছিলেন সারাটা সময় । ১৪–১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে ৮০–৮৫ বছরের বয়সি হাজারো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে শিক্ষার বন্ধন কতো শক্তিশালী। বয়সের ব্যবধান ভুলে সকলেই এখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছেন পুরোটা সময়। স্কুল প্রাঙ্গন পরিণত হয়েছে ভালোবাসার মিলনমেলায়। এ মিলনমেলাকে কেন্দ্র করে এবিসি প্রাঙ্গনে বসেছিলো ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। আশেপাশের বহু গ্রাম এবং দূরদুরান্ত থেকে গ্রামের সাধারণ গৃহিনীরাও সমবেত হয়েছে সেই মেলায়। মেলায় নাগরদোলায় চড়া, টুকটাক কেনাকাটা করা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে রাতে গ্রামের রাস্তা ধরে দলে দলে সকলেই ফিরে গেছে নিজ বাড়িতে। অন্যরকম আনন্দ আয়োজনে মেতেছিলো ফটিকছড়িবাসী।
চমৎকার একটা দিন উদযাপন করেছি আমরা। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আমার বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। সবার আন্তরিকতা, ভালোবাসা, হৃদ্যতা অবর্ণনীয়। দৌলতপুর এ.বি.সি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম পুনর্মিলনী। মাত্র তিন মাসের প্রস্তুতিতে পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষকদের অংশগ্রহণে এতো বড় একটা আয়োজন। এতো সুশৃংখল, সুন্দর, পরিপাটি, গোছানো প্রোগ্রাম শুধুমাত্র ফটিকছড়িতে নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। সবার সহৃদয় উপস্থিতি এবং সময়ের প্রতি সচেতনতা পুরো দিনটাকে অন্যরকম একটা আবহ দিয়েছে। আবহাওয়া যেমন চমৎকার ছিলো তেমনি চমৎকার ছিলো সারাদিনের আয়োজন। এ আয়োজনে বক্তৃতার হুংকার ছিলো না, নিজেকে প্রকাশের আতিশয্য ছিলো না। ছিলো শুধু প্রাণের উচ্ছ্বাস। আনন্দ আর আনন্দ! ৬৩ বছরের সকল ব্যাচের সানন্দ উপস্থিতি বিমোহিত করেছে সবাইকে। আমরা এবিসিয়ান। আমাদের এ বন্ধন অটুট থাকুক। “এসো মিলি শেকড়ের টানে, প্রিয় ক্যাম্পাসে”–এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে একত্রিত হয়েছি প্রায় ১৭০০ নিবন্ধিত এবিসিয়ান। “আমরা পারি, আমরা পারবো”– আমাদের এ স্লোগান অতীতে প্রমাণিত হয়েছে। বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এই উৎসবে আবারো প্রমাণিত হলো ‘আমরা পারি, আমরা পারবোই’!











