এলাকায় সমাজ সেবক পেশায় ডাকাত সর্দার

৩৩ লাখ টাকার সিগারেট লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১ জুন, ২০২১ at ১২:১৬ অপরাহ্ণ

গরু চোর যখন সমাজ সেবক! গরু চুরির মাধ্যমে অপরাধ জগতে তার প্রবেশ। চুরি করতে করতেই হয়ে উঠেন ডাকাত সর্দার। ২০ লাখ টাকার নিচে চুরি বা ডাকাতি করে পোষায় না তার। নিজের খরচ আছে, দল চালাতে হয় আবার সমাজ সেবাও করতে হয়। এলাকার মানুষ তাকে সমাজসেবক হিসেবেই জানে, মানে। নাম তার নূরনবী। আবুল খায়ের গ্রুপের পরিবেশকের গুদাম থেকে ৩৩ লাখ টাকার সিগারেট লুটের মূল হোতা নূরনবীকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর এ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গত পাঁচ বছরে চক্রটি ৫০টি ডাকাতির ঘটনায় প্রায় ১০ কোটি টাকার মালামাল লুট করে। নূরনবীর সাথে ধরা পড়েছে তার দুই সহযোগী পিতা-পুত্র। কুমিল্লার স্টেশন রোডের মুদি ব্যবসায়ী শাহজাহান ও তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে শান্ত। নূরনবীর দলের কাছ থেকে লুটের সিগারেট কিনেছিলেন তারা। ডবলমুরিং থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন আজাদীকে জানান, এ ডাকাতির সাথে আরও ৯ থেকে ১০ জন জড়িত থাকলেও ধরা পড়েছে মাত্র একজন। তারা কোন গাড়ি ব্যবহার করে ডাকাতি করেছে, বিক্রি করা টাকা কিভাবে বন্টন ও খরচ করেছে সেসব বিষয়ে নূরনবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শান্তকেও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন কতদিন ধরে তারা এসব মালামাল কিনছে। তাই আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নূরনবী ও শান্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। প্রসঙ্গত: সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) আব্দুল ওয়ারিশ জানান, গত ২৭ মে নগরীর ডবলমুরিং মডেল থানার পোস্তারপাড় এলাকায় আবুল খায়ের গ্রুপের ডিলার খাজা ট্রেডার্সের গোডাউনে সংঘটিত দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। ১০-১২ জনের একটি ডাকাত দল ৩ টনের একটি ট্রাকে করে এসে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দারোয়ানসহ ৩ জনকে মারধর করে ডাকাতি করে। ওই ডাকাতির ঘটনার লুন্ঠিত ৯২ কার্টন সিগারেট এবং দুই কার্টন বিক্রির ৬৮ হাজার টাকা দুই ক্রেতা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় চক্রের মূল হোতাসহ ওই দুই ক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যেভাবে গ্রেপ্তার নূরনবী : গত ২৭ মে ভোরে আবুল খায়ের গ্রুপের পরিবেশকের গুদাম থেকে ৩৩ লাখ টাকার সিগারেট লুট করেই নূরনবী কুমিল্লায় গিয়ে মালামাল ১৯ লাখ টাকায় বিক্রি করে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। আসার সময় তার তৃতীয় স্ত্রীকেও সাথে নিয়ে আসেন। এক পরিচিত ব্যক্তির বাসায় স্ত্রীকে রেখে নিজে থাকেন একটি আবাসিক হোটেলে। সেখান থেকে পরদিন বাড়বকুণ্ডে এক সহযোগীর বাড়িতে গিয়ে উঠে স্ত্রীকে নিয়ে। আর সেখান থেকে গ্রেপ্তার হয়। বাড়বকুণ্ড থেকে রোববার সে হাতিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল। তার আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। নগরীর ডবলমুরিং থানা পুলিশের সাথে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দলও তাকে ধরতে অভিযানে অংশ নেয়।
নূরনবীর অপরাধ জীবন : গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে নূরনবী তার অপরাধ জগতে প্রবেশের কথা জানায় পুলিশকে। নূরনবী বলে, বছর দশেক আগে গরু চুরি করে অপরাধ জগতে আসেন নূরনবী। পরে নিজেই দল গড়ে তোলে, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকাতি করে বেড়ায়। তাদের দলে ২০-২৫ জন সদস্য আছে। বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করতে গিয়ে স্থানীয় কিছু লোকজনকেও তারা যুক্ত করে দলে। রেকি করে নূরনবী নিজেই। তারপর নোয়াখালী, হাতিয়া ও কুমিল্লা থেকে লোক জড়ো করে পিকআপ নিয়ে সেখানে চলে যায়। স্থানীয় কিছু লোকজন নিয়ে ডাকাতি করে দ্রুত সময়ে ফিরে আসে। যে স্থানে নূরনবী ডাকাতি করবে সেখানে ব্যবহার করা মোবাইল ফোন ও সিম বন্ধ করে নতুন নম্বর থেকে যোগাযোগ শুরু করে। নূরনবী ছাড়াও তার অন্য দুই ভাইও ডাকাত দলের সদস্য জানিয়ে ডবলমুরিং থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন জানান, নূরনবীর বড় ভাইও ডাকাতির মামলায় কারাগারে আছেন।
বাধা পেলেই গোলাগুলি, খুন : ওসি মোহাম্মদ মহসীন জানান, ডাকাতির জন্য দেশের সবপ্রান্তেই তার লোক আছে। ডাকাতিতে বাধা পেলেই গোলাগুলি, খুন সবই করে নূরনবীর দল। পতেঙ্গা এলাকায় গত মার্চ মাসে নৈশ প্রহরীকে খুন করে আকিজ গ্রুপের একটি গুদাম থেকে সিগারেট লুটের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন নূরনবী। একই কায়দায় কুড়িগ্রামেও খুন করে ডাকাতি করার কথা জানিয়েছে। সিলেট, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পুলিশ নূরনবীকে খুঁজছে। তবে এক স্থানে বেশি সময় না থাকা এবং ঘনঘন মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করায় তার অবস্থান শনাক্ত করা দূরূহ হয়ে উঠে।
টার্গেট তার সিগারেট : নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-বন্দর) নোবেল চাকমা জানান, আগে বিভিন্ন দোকানে ডাকাতি করলেও বছর খানেক ধরে নূরনবী ও তার দলের টার্গেট বিভিন্ন সিগারেটের দোকান ও গুদাম। মালামাল রাখতে সুবিধা, সহজে বিক্রি ও বহনের জন্য সে সিগারেটের গুদাম কিংবা দোকানগুলো বেছে নেয়। যেসব দোকানে অন্তত ২০ লাখ টাকার সিগারেট পাওয়া যাবে সেসব দোকান কিংবা গুদাম হচ্ছে তাদের ডাকাতির লক্ষ্য। এক জেলায় ডাকাতি করে অন্য জেলায় পাড়ি জমান বিশ-পঁচিশ জনের এই ডাকাত চক্র। এর ধারাবাহিকতায় গত পাঁচ মাসে ৬ ডাকাতির ঘটনায় কোটি টাকার উপরে সিগারেট লুট করেছে তারা। সর্বশেষ আবুল খায়ের গ্রুপের ডিলার খাজা ট্রেডার্সের গোডাউনে ডাকাতি করে। গত কয়েক মাসে চান্দগাঁও কামাল বাজারে রফিক স্টোর নামে একটি দোকান থেকে ২৫ লাখ টাকার ৭৩ কার্টন, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে আফজাল হোসেন নামের একজনের প্রতিষ্ঠান থেকে ২২ লাখ টাকার ৬৩ কার্টন সিগারেট ও নগদ দেড় লাখ টাকা, সর্বশেষ ডবলমুরিং থানার পোস্তার পাড়া থেকে ৩৩ লাখ টাকার ৯৪ কার্টন সিগারেট লুট করার তথ্য দিয়েছে গ্রেপ্তার নূরনবী। এছাড়া চাঁদপুরের কচুয়ায় সাইফুল স্টোর নামের প্রতিষ্ঠানের ২২ কার্টন সিগারেট, সাড়ে চার লাখ টাকা ও টেকনাফের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২২ লাখ টাকার সিগারেট লুট করেছে নূরনবীর বাহিনী। পোস্তারপাড় ডাকাতির আগে তারা পাহাড়তলী সরাইপাড়া এলাকায় আবুল খায়ের গ্রুপের আরেকজন পরিবেশকের গুদামে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ হয়ে তারা পোস্তার পাড় আসে। গাড়ি চালানোয় দক্ষ নূরনবী বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি করে মালামাল ভর্তি পিকআপ নিজেই চালিয়ে নিয়ে যান বলে জানান গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক প্রিটন সরকার।
মালামাল বিক্রি কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে : এডিসি নোবেল চাকমা জানান, ডাকাতির মালামাল তারা নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের পরিচিত দোকানে তারা মালামালগুলো বিক্রি করে। মালামাল বিক্রির জন্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেন দলের এক সদস্য। ২৭ মে চট্টগ্রাম থেকে লুট করা সিগারেটগুলো কুমিল্লায় বিক্রি করা হয়েছিল। নূরনবীকে গ্রেপ্তারের পর সে জানিয়েছে সকাল আটটার মধ্যেই তারা লুট করা সিগারেট নিয়ে কুমিল্লার স্টেশন রোড এলাকায় পৌঁছে যায় । সেখানে আগে থেকেই শাহজাহানের ছেলে শান্তর সাথে তারা যোগাযোগ করে রেখেছিল সিগারেট বিক্রির জন্য। শান্তর কাছে ১৯ লাখ টাকায় সিগারেটগুলো বিক্রি করে তারা চলে আসে। গ্রেপ্তার শাহজাহানের কুমিল্লা স্টেশন রোডে একটি মুদির দোকান আছে। তারা কম দামে সিগারেট কিনে বেশি দামে বিক্রির জন্য।
‘সমাজ সেবক’ নূরনবী : এডিসি নোবেল চাকমা জানান, ডাকাত নূরনবী তার নিজ এলাকার মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে ‘সমাজ সেবক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। স্থানীয় একটি ক্লাবের সভাপতিও তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথেও তার সখ্যভাবের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। যার নির্বাচনে সহায়তার জন্য নূরনবী হাতিয়া যেতে চেয়েছিল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখালেদা জিয়া দেশেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা পাচ্ছেন : হাছান
পরবর্তী নিবন্ধজনশক্তি রপ্তানিতে ধস