রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিতে ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট–ট্যাক্স অব্যাহতির সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। একইসাথে এলপি গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণ করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে জরুরি চিঠি দেয়া হয়েছে। সরবরাহ সংকট, কারসাজির অভিযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযানের মধ্যে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ এল। অপরদিকে সরকারের উদ্যোগ এবং বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গতকাল বিকালে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
এলপি গ্যাস নিয়ে সংকট দেখা দেয়ার প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো ‘এলপি গ্যাস আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনঃনির্ধারণ’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, ‘দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয়, যা শিল্পখাত ও গৃহস্থালি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত শীতকালে বিশ্ববাজারে ও দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ে। একই সময়ে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও তুলনামূলক কম থাকায় এলপি গ্যাসের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে এসব কারণে বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।’
উপ সচিব মিয়া মোহাম্মদ কেয়ামউদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, সামপ্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে গ্যাস সংকট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। সেখানে এলপি গ্যাসকে ‘গ্রিন ফুয়েল’ বিবেচনায় আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনঃনির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়।
গত ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের আলোচনায় এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাবকে সময়োপযোগী বলা হয়। তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কতটা কমবে, তা বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
মন্ত্রণালয় বলছে, উপদেষ্টা পরিষদের ওই সিদ্ধান্ত পরে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থাপন করা হলে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে। যদিও অপারেটরদের একটি অংশ আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে শূন্য শতাংশ ভ্যাটের দাবি জানায়।
চিঠিতে বলা হয়, উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে অপারেটররা ওই প্রস্তাবে ‘একমত’ হয়েছেন।
বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বর্তমান সংকট বিবেচনায় আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১০ শতাংশের নিচে নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।
একইসাথে এলপি গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ ও এলসি খোলা সহজ করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন–২ শাখা। চিঠিতে বলা হয়েছে যে, এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ থেকে আরও জানানো হয় যে, এলপিজি–কে সবুজ শিল্প বা গ্রীণ ইন্ডাষ্ট্রি হিসাবে গণ্য করতঃ সবুজ শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে গঠিত গ্রীণ ফান্ড হতে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করা গেলে এলপিজি সেক্টরে সৃষ্ট সমস্যা নিরসন করা সম্ভব হবে এবং এলপিজি ব্যবহারকারীদের জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামে এলপিজি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এমতাবস্থায়, বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উল্লিখিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঋণ প্রাপ্তি ও এলসি খোলার আবেদনসমূহ দ্রুত ও অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গভর্নরকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিইআরসি জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা করেছে। কিন্তু কমিশনের ঠিক করে দেওয়া দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া যায় না। সরবরাহ সংকটের কথা বলে গত এক মাস ধরেই প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি রাখছেন বিক্রেতারা।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, এলপিজির ‘ঘাটতি নেই’, সংকটের কারণ ব্যবসায়ীদের একটি অংশের কারসাজি।
গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেশি রাখার কারণে দেশজুড়ে অভিযান শুরু হলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। তাতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাট কমানোর সুপারিশের পাশাপাশি আমদানিকারকদের জন্য ব্যাংক ঋণ ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।












