দেশের দ্রুত বর্ধনশীল এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাজারে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এলপিজি আমদানি ও বিতরণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এতে এলপিজি সরবরাহে স্থিতিশীলতা, মূল্য অস্থিরতা কমানো এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিন উল আহসান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে পাঠানো সরকারি পত্রে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি ও মূল্যের অস্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভোক্তাগণ অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে এলপিজি ক্রয়ে বাধ্য হচ্ছেন মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বিপিসি কর্তৃক এলপিজি আমদানি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিকট সরবরাহের বিষয়ে পর্যালোচনাপূর্বক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব প্রেরণের নিমিত্ত আলোচনা হয়।
বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকারি পর্যায়ে বা বিপিসি কর্তৃক সরাসরি এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা নেই। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহ বিঘ্ন দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ সীমিত হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) উপজাত হিসেবে উৎপাদিত এলপিজি দিয়ে বিপিসি দেশের চাহিদার কেবল ১.৩৩ শতাংশ পূরণ করে।
চিঠিতে বলা হয়, বিপিসি এলপিজি আমদানি করলে বর্তমানে বিপিসির নিজস্ব পর্যায়ে এলপিজি সংরক্ষণ ও খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন জেটিভিত্তিক পাইপলাইন, ফ্লোমিটার, স্টোরেজ ট্যাংক প্রভৃতি নেই। তবে দেশে বিদ্যমান বেসরকারি এলপিজি অপারেটর প্রতিষ্ঠানসমূহ কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকায় এলপিজি বহনকারী জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস ও পরবর্তীতে নিজস্ব টার্মিনালে সংরক্ষণ করে থাকে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে আগ্রহী বেসরকারি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের লাইটারিং জাহাজ ব্যবহার করে এলপিজি খালাস ও বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
এক্ষেত্রে এলপিজি অপারেটরর্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ লোয়াবের সাথে আলোচনা করে আগ্রহী অপারেটর প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুতকরণ, আমদানিতব্য এলপিজির পরিমাণ নির্ধারণ, মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি, খালাস ও বণ্টন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নির্ধারণ করা যেতে পারে।
চিঠিতে দেশের জ্বালানি তেলের ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, অতীতে দেশে জ্বালানি তেলের আকস্মিক চাহিদা বৃদ্ধি বা সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে বিপিসি কর্তৃক তালিকাভুক্ত জি–টু–জি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে কোটেশন আহ্বানের মাধ্যমে অতিরিক্ত আমদানির নজির বিদ্যমান রয়েছে। অনুরূপভাবে, বিপিসির তালিকাভুক্ত জি–টু–জি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যেহেতু বৃহৎ পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবং এলপিজিসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহে সক্ষম, সেহেতু উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের নিকট থেকে কোটেশন আহ্বানের মাধ্যমে এলপিজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসসমূহও যাচাই–বাছাই করা যেতে পারে। সকল সম্ভাব্য উৎস পর্যালোচনাপূর্বক সর্বোত্তম উৎস নির্বাচন করে এলপিজি আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।
চিঠিতে দেশের বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ এবং এলপিজি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিপিসি কর্তৃক এলপিজি আমদানিপূর্বক বেসরকারি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের নিকট সরবরাহের বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুশাসন ও নীতিগত অনুমোদন কামনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, লোয়াবের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিপিসি যে যৌথ কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে বিপিসি বৃহৎ পরিসরে আমদানি সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় দরকষাকষির শক্তি ব্যবহার করে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
তারা বলছেন, সরকারিভাবে বিপিসি যুক্ত হলে এলপিজি আমদানিতে ভলিউম ডিসকাউন্ট, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। এতে করে বেসরকারি অপারেটরদের কাঁচামাল সংকট কমবে এবং ভোক্তারা হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবে। একইসঙ্গে এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করবে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রগুলো জানায়, বিপিসির এই প্রস্তাব নীতিগতভাবে ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হচ্ছে এবং অনুমোদন পেলে অচিরে একটি সমন্বিত এলপিজি আমদানি ও বণ্টন মডেল চালু হতে পারে, যা দেশের এলপিজি বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান ঘটাতে পারে।
এলপিজি অপারেটরর্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বিপিসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আজাদীকে বলেন, এতে ক্রমবর্ধমান এলপিজির যে বাজার তাতে স্থিতিশীলতা থাকবে। ভোক্তারা উপকৃত হবেন। সরকারি–বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি ও বাজারজাতকরণের এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করবে।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতে আমদানি এবং বাজারজাত করা হয়।












