এলপিজি খাতে নিয়ন্ত্রক জটিলতা, অতিরিক্ত খরচ

নিতে হয় ২৬টির বেশি অনুমোদন ও লাইসেন্স, বছরে খরচ ২ কোটি টাকা ঝুঁকিতে বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংস্কারে জোর

হাসান আকবর | রবিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাত বর্তমানে নিয়ন্ত্রক জটিলতা, অতিরিক্ত খরচ এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটি এলপিজি কোম্পানিকে নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে ২৬টির বেশি অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হয়, যার অধিকাংশ বছরভিত্তিক নবায়নযোগ্য। এসব লাইসেন্স এবং অনুমোদনের পেছনে বছরে দুই কোটির বেশি টাকা খরচ করতে হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে। এর যোগান দিতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের। পুরো প্রক্রিয়াটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রতি বছর এর পরিমাণ বাড়ছে। গৃহস্থালি, পরিবহন, শিল্প এবং গ্রামীণ জ্বালানি হিসেবে এলপিজি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। দেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি যোগান দেয় বেসরকারি খাত। সরকারি খাতে বিপিসি মাত্র ১.৩ শতাংশ এলপিজি যোগান দেয়, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তেল পরিশোধনকালে উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। বেসরকারি খাতে অন্তত ২৬টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে বাজারজাত করে। এ খাতে এখন প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে, যার পুরোটাই বেসরকারি খাত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে এলপিজি অপারেটরদের লাইসেন্স ও অনুমোদনের জন্য বিইআরসি, বিপিসি, ডিওই, বিএসটিআই, বিআইডব্লিউটিএ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে যেতে হয়। প্রায় সব লাইসেন্স বার্ষিক নবায়নের আওতায় পড়ে এবং এর জন্য বারবার শারীরিকভাবে দপ্তরে যেতে হয়, নথি জমা দিতে হয় ও একাধিক পরিদর্শনের মুখোমুখি হতে হয়। জটিল ব্যবস্থার কারণে কাজের অহেতুক জটিলতা, পুনরাবৃত্তি, দেরি এবং আইনগত অনিশ্চয়তা তৈরি করে। সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় এটা ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।

এসব লাইসেন্স ও কমপ্লায়েন্স খরচ প্রায় ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিইআরসি লাইসেন্স ফি বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা, বিআইডব্লিউট লাইসেন্স চার্জ প্রায় ৩৮.৬ লাখ টাকা, বিপিসি লাইসেন্স নবায়ন ফি ৫ লাখ টাকা, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত সনদ ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং বিএসটিআই ও অন্যান্য পরীক্ষার ফি বাবদ বড় অংকের অর্থ প্রতি বছর খরচ হয়। এর সাথে যোগাযোগ, জনবল, ভ্রমণ, দেরিজনিত ক্ষতি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা আনুষাঙ্গিক খরচ হয় জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এই খরচ আমাদের মোট পরিচালন ব্যয়ে যুক্ত হয়। এই বিপুল ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে মান পরীক্ষার সনদ থাকলেও বাংলাদেশে এসে প্রতিটি কোম্পানিকে নিজ নিজ কারখানায় আলাদা ল্যাব স্থাপন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে প্রতি প্ল্যান্টে প্রায় দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও জনবল খরচ যোগ হচ্ছে। অথচ এতে নিরাপত্তার বাড়তি কোনো সুবিধা মিলছে না।

বর্তমানে এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টকে ইয়েলো ক্যাটাগরি এবং জেটিগুলোকে অরেঞ্জ ক্যাটাগরি হিসেবে ধরা হয় উল্লেখ করে এলপিজি খাতের বিনিয়োগকারীরা বলেন, অথচ এগুলো মূলত ক্লোজড লুপ স্টোরেজ ও স্থানান্তর ব্যবস্থা, যেখানে বায়ুদূষণ বা দহন প্রক্রিয়া নেই। ফলে অপ্রয়োজনীয় পরিদর্শন শুধু শুধু খরচ বাড়াচ্ছে।

সূত্র বলেছে, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এলপিজি খাতে একক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বহু বছর মেয়াদি লাইসেন্স ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যেমন পাকিস্তানে ওজিআরএ, ভারতে পিইএসও এবং ইপিইএসও, তুরস্কে ইএমআরএ ইত্যাদি। ওই দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স ও কম পরিদর্শনের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, যদি বিইআরসি এবং বিডার অধীনে একক অনলাইন পোর্টাল তৈরি করা হয়, যেখানে সব লাইসেন্সের ডিজিটাল আবেদন, নবায়ন ও পেমেন্ট প্রদানের সুবিধা থাকবে। একীভূত পরিদর্শন ব্যবস্থা, সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার ব্যবহার, এলপিজি প্ল্যান্ট ও জেটিকে গ্রিন ক্যাটাগরিতে পুনর্বিন্যাস করা হলে এই খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়বে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে। তারা বলেন, উপরোক্ত পদক্ষেপ নেয়া হলে ৭০৮০ শতাংশ শারীরিক দপ্তর ঘোরাঘুরি কমবে। খরচ কমবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে।

এলপিজি অপারেটর্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বলেন, এলপিজি খাত দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত। এই খাতে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। বেসরকারি খাতের এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সংস্কার মানে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া নয়, বরং স্মার্ট ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা। বর্তমান জটিল ব্যবস্থা বজায় থাকলে বিনিয়োগ কমবে, অবকাঠামো উন্নয়ন থমকে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তাই এলপিজি খাতকে টেকসই ও নিরাপদ রাখতে দ্রুত নিয়ন্ত্রক সংস্কার জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবোয়ালখালীতে ৬ আগ্নেয়াস্ত্রসহ দুই ভাই গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধ২০ বছর ৭ মাস পর চট্টগ্রামে আসছেন তারেক রহমান