চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন বহুল জনপ্রিয় পরিচিত মুখ সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম সিরাজুল ইসলাম। যাকে এমপি সিরাজ হিসেবে সবাই এখনো জানে এবং চিনে। ২০০৩ সালের আজকের এই দিনে মহান রবের ইচ্ছায় পরপারে পাড়ি জমান তিনি। পেছনে রেখে যান অনেক গল্পমাখা স্মৃতি বা কর্মের শত–সহস্র নিদর্শন। যেগুলো তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে অনবরত। না মরেননি এখনো তিনি। নিজ কৃত কর্মের মাধ্যমেই এখনও বেঁচে আছেন উনি সবার অন্তর আর অকৃতিম ভালোবাসার মাঝেই। থাকবেন এভাবে অন্তত আরো কয়েক যুগ ধরে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবক হিসেবে একেবারে ইউনিয়ন থোকেই উঠে এসেছিলেন তিনি। প্রথমে নিজ এলাকা বোয়ালখালী চরন্দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পরে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় ও ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি‘র প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম –৮ (তৎকালীন চট্টগ্রাম–১০) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন সাধনের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের মণি কোঠায় জায়গা করে নেন তিনি। তাঁর সে জায়গাটি এতই মজবুত ছিল যে সেটি অন্য কেউ এখনো টলাতে পেরছেন বলে মনে হয়না। তাইতো মৃত্যুর এতটি কাল পেরিয়ে এসেও এলাকার হাটবাজার অলিগলি ও চায়ের দোকান থেকে আরম্ভ করে বাড়ির বৈঠক খানায় পর্যন্ত তাকে নিয়ে আলোচনা হয় এখনো। আবাল বৃদ্ধা–বনিতা সবার মুখে–মুখে তারঁ নামটি ঘুরেফিরে এখনো বারবার। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন উপজেলা যুব বিষয়ক সম্পাদক ও স্থানীয় পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মাহম্মদুল হক মেম্বারের কথায়– আমরা এলাকায় থেকেও এলাকা সম্পর্কে যা জানতাম না তার চেয়ে ঢের বেশি জানতেন এমপি সিরাজ সাহেব। সারা উপজেলার এমন অলিগলি কিংবা মানুষজন বাদ ছিল না যাদের অবস্থা তিনি রাখতেন না বা জানতেন না। সব খবরা–খবর ছিল একেবারে উনার নখদর্পণে। সুতরাং উনাকে ফাঁকি দেয়া কারো সম্ভব ছিল না। তিনি আরো বলেন– ৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উনার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগের নব্য ধনকুবের রেডকাউ খ্যাত শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বি এস সি। দেখা যায় রেডকাউয়ের কারিকারি টাকার গন্ধে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন ততকালীন পার্টির দায়িত্বশীলদের মধ্যে বেশিরভাগই। ফলে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল সিরাজ সাহবের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয়নি তাঁদের। কিন্তু তৃণমূল কর্র্মীরা সিরাজ সাহেবকে পিঠ দেখান নি সেদিন–টেনে নিয়েছিলেন বুকে। তারা সেদিন নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সিরাজ সাহেব কিংবা বিএনপির ধানের শীষের জয় ছিনিয়ে এনে প্রমাণ করেছিলেন নেতা বিক্রি হয়– কর্মী বিক্রি হয় না এত সহজে।
স্থানীয় বোয়ালখালী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক এম এ মন্নান বলেন–সব চাইতে বড় সন্তুষ্টির ব্যাপার হচ্ছে দীর্ঘদিন দল ও সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করে গেলেও কোন সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ উনার কাছে আশ্রয় পেয়েছেন এমন অভিযোগ শুনিনি কখনো। তবে অসহায় এলাকাবাসী ও দলের ত্যাগী নেতা কর্মীদের জন্য তাঁর দরজা যে খোলা থাকত সবসময় এমন সাক্ষ্য প্রমাণ অনেক। ঐতিহ্যবাহী বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ, চরন্দ্বীপ ইউসি উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজ–কামাল স্কুল থেকে আরম্ভ করে উপজেলার এমন কোন স্কুল –কলেজ, মসজিদ –মাদ্রাসা ও মন্দির বাকী নেই যে তাঁর হাতের ছোঁয়া লাগেনি। এমন রাস্তাঘাট – হাটবাজার ও অলিগলি বাদ নেই তাঁর উন্নয়ন তালিকায় ছিল না। যেগুলি এখনও তাঁর কীর্তি বহন করে যাচ্ছে সমানতালে। কথায় আছে ‘একজন মানুষের ভালো কাজ, কৃতিত্ব এবং উত্তরাধিকার হলো সেই জিনিস যা মৃত্যুর পরেও তাকে স্মরণীয় করে রাখে।’ যা কালের স্রোতে কখনও মলিন হয় না। সুতরাং সিরাজ সাহেবের কীর্তিই তাঁকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও রাখবেন শত সহস্র বছর ধরে। থাকবেন তিনি এলাকাবাসীর মানসপটে চির অমলিন হয়ে। গতকাল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। এই দিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক: শিক্ষক ও সাবেক সভাপতি,
বোয়ালখালী প্রেসক্লাব।











