এনসিটি ইস্যু নিয়ে বিক্ষোভ

শনি ও রোববার বন্দরের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা বন্দর শ্রমিক দলের কর্মসূচিতে স্কপের একাত্মতা

হাসান আকবর | শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরে আগামীকাল শনিবার থেকে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের ভিতরেই বিক্ষোভ হয়েছে। শতাধিক আন্দোলনকারী বন্দর ভবনে জড়ো হয়ে ‘গো ব্যাক, গো ব্যাকডিপি ওয়ার্ল্ড’ স্লোগান দেয়। পরবর্তীতে তারা সরে গেলেও বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে বিদেশী অপারেটর ইস্যুতে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এদিকে গতকাল সকালে নগরীর আগ্রাবাদের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক দলের নেতারা আগামীকাল শনিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আগামী রোববার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রশাসনিক ও অপ্রশাসিক সব কার্যক্রমও বন্ধ থাকার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

যদি এর মধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, বন্দরকে বেসরকারিকরণ হবে না মর্মে ঘোষণা না দেয় তাহলে রোববার নতুন করে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হতে পারে বলেও নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের জানান। তারা বলেন, আমরা সবাই সব ভেদাভেদ ভুলে এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের (সাবেক সিবিএ) অন্যতম নেতা মো. হুমায়ুন কবীর, ইব্রাহীম খোকন, মো. হারুন, তসলিম হোসেন সেলিম প্রমুখ। অপরদিকে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম গতকাল বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালকে বিদেশী অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা প্রদানের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয় যে, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ মাত্র ১০ দিন পর, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি, অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে তা নজিরবিহীন, অগ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।

চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে এই ধরনের আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে সরকারকে অবিলম্বে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত উপস্থাপন করেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত। বন্দর বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক কাজি শেখ নুরুল্লাহা বাহার, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান, কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, এডভোকেট ইমরান হোসেন, আল কাদেরী জয়, বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের অন্যতম নেতা হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহীম খোকন, ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম প্রমুখ।

সাংবাদিক সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় মাত্র ১২ দিনের মধ্যে দরপত্র সংশোধন, টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইভ্যালুয়েশন, নেগোসিয়েশন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদনসহ পুরো কনসেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার একটি সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি করছে বলেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

স্কপ ছয়টি মৌলিক কারণে চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটি ইজারা চুক্তির বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে বলা হয় যে, প্রথমত, এটি একটি কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী কোম্পানির হাতে এই টার্মিনাল তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তৃতীয়ত, ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অতীত রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। চতুর্থত, প্রস্তাবিত ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেশের সামগ্রিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট ও বন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। পঞ্চমত, চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ননকমপ্লায়েন্সের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে এবং রাষ্ট্রের হাতে কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তা নেই। এবং ষষ্ঠত, একটি অনির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের আলোচনা ছাড়া ৪০ বছরের জন্য জাতীয় সম্পদ হস্তান্তরের কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক বৈধতা নেই।

স্কপ বন্দর শ্রমিক দল ঘোষিত আগামীকাল শনিবার এবং রোববারের কর্মবিরতি কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা, সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং সমর্থন জ্ঞাপন করে। স্কপ চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বস্তরের শ্রমিক কর্মচারীদেরকে বন্দর শ্রমিক দল কর্তৃক ঘোষিত কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দেয়ার উদাত্ত আহ্বান জানায়। আগামী রোববার বেলা ১১টায় বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা সম্বলিত বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জট চলছে। লাইটারেজ জাহাজের সংকটের মুখে দেড় শতাধিক মাদার ভ্যাসেল কয়েক লাখ টন পণ্য নিয়ে সাগরে অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছে। বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের অতীতের ধকল সামলে একটি স্বাভাবিক গতিশীলতা বিরাজ করছিল। নতুন করে দুইদিনের কর্মবিরতিতে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা শংকা প্রকাশ করেছেন।

গতকাল ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা স্বাভাবিক রাখার জন্য বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল থাকা জরুরি। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া মানেই দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়া। বিষয়টি দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর উল্লেখ করে তারা বন্দর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠলে তার ধাক্কা জাতিকেই সামলাতে হবে বলে মন্তব্য করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাহাজে গম নিয়ে ৩৪ দিন ধরে ভাসছি, আমদানিকারক খালাস করছে না
পরবর্তী নিবন্ধরোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন : প্রধান উপদেষ্টা