২০২০ সালের ৩ এপ্রিল। নগরীর দাম পাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এর মাধ্যমে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় চট্টগ্রামে। এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই যেন রাজ্যের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেমে আসে চট্টগ্রাম জুড়ে। ব্যস্ততা বাড়ে স্বাস্থ্য বিভাগসহ পুলিশ-প্রশাসনে। লকডাউন করা হয় আক্রান্ত ব্যক্তির বাসা-বাড়ি। যেন শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতি!
আজ ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল। কাটায় কাটায় ২ বছর পূর্ণ হলো সেদিনের। তবে ২ বছর আগের সেই দিনের পরিস্থিতি আর আজকের পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন। আক্রান্তের খবর পেলেও এখন আগের মতো ভয়-ডর নেই মানুষের মাঝে। পরবর্তীতে দিনে সহস্রাধিক রোগীও শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামে। কিন্তু দু বছর আগে প্রথম রোগী শনাক্তের খবরে যে উদ্বেগ, সহস্রাধিক শনাক্তেও যেন সেই উদ্বেগ আর দেখা যায়নি মানুষের মাঝে। শুরু থেকে করোনা নিয়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক কাজ করলেও এখন আর সে আতঙ্ক নেই বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ও বর্তমানে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। বর্তমানে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় মানুষের ভয়-ডর উধাও হয়ে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।
তাছাড়া শুরুর দিকে আক্রান্ত হলেই যে হারে মানুষকে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে, পরবর্তীতে সেভাবে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। বাসায় চিকিৎসা নিয়েই মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ফলে মানুষের আতঙ্ক কেটে গেছে। এখন তো করোনাও রীতিমতো স্বাভাবিক সর্দি-জ্বরের মতো হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে দুবছর আগের পরিস্থিতি আর এখনকার চিত্র বদলে গেছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় (১ এপ্রিল) ২৭৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় একজনেরও করোনা শনাক্ত হয়নি চট্টগ্রামে। হিসেবে দুই বছরের মাথায় চট্টগ্রাম করোনা শূন্য। যদিও ২ এপ্রিল ৪৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ চৌধুরী। বেশ কয়মাস ধরেই করোনা আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা দুই-একজনে নেমেছে চট্টগ্রামে। বর্তমানে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানান সিভিল সার্জন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে সবমিলিয়ে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৬১৯টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে চট্টগ্রামে। এরমধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২৯ জনের। হিসেবে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে গড়ে প্রায় ১৩ শতাংশের শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে মহানগরের বাসিন্দারা। মোট শনাক্তের ৯২ হাজার ৯১ জনই মহানগরের (৭৩ শতাংশ)। বাকি ৩৪ হাজার ৫৩৮ জন (২৭ শতাংশ) উপজেলার। নমুনা পরীক্ষাও বেশি করিয়েছেন মহানগরের বাসিন্দারা। মোট নমুনা পরীক্ষার ৮৮ শতাংশই (৮ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪৩টি) মহানগরের। আর ১২ শতাংশ (১ লাখ ১৫ হাজার ২৭২টি) উপজেলার।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, দুই বছরে আক্রান্তদের ১৪ হাজার ৭১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এর মাঝে মহানগরের রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ১৪৭ জন। আর উপজেলার রোগী সংখ্যা ৩ হাজার ৫৬৩ জন।
এদিকে, আক্রান্তদের মাঝে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৩৬২ জনের। এর মাঝে মহানগরে মৃত্যু হয়েছে ৭৩৪ জনের। আর উপজেলায় মৃত্যু ৬২৮ জনের। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে হাটহাজারীতে। দুই বছরে এ উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৭৩০ জনের করোনা শক্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মাঝে মৃত্যু হয়েছে ১২৪ জনের। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে কর্ণফুলি উপজেলায়। এ উপজেলায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র ৭ জন। আর মৃত্যু শূন্য। যদিও শুরুর দিকে কর্ণফুলি এলাকার বাসিন্দাদের পটিয়া উপজেলার অধীনে হিসাবভূক্ত করা হয় বলে জানান সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া।












