নগরে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্য থেকে মাত্র এক হাজার টন ব্যবহার করে ১৫ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যার মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহযোগ্য বিদ্যুৎ হবে ১২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে গৃহীত ২৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে চসিকের সরাসরি কোনো মূলধনী বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে না, বরং বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
‘চট্টগ্রাম শহরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প’র সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। জাপানের প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন এবং ইয়চিও ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন যৌথভাবে এ সমীক্ষা চালায়। গতকাল সোমবার নগরের একটি হোটেলে সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরের ল্যান্ডফিলে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। এতে নগরে বিদ্যমান ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়বে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে। নগর পরিবেশ হবে পরিচ্ছন্ন এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত হবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন নামের প্রতিষ্ঠানটি নগরে ২০২২ সালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে ‘ইন্টিগ্রেটেড ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট’ প্রকল্পের আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমীক্ষা চালায় জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন এবং ইয়চিও ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদল দ্বিতীয় ধাপের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করার কথা জানায়। এ সমীক্ষা রিপোর্ট গতকাল উপস্থাপন করা হয়েছে।
সমীক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনটি ব্যবসায়িক মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সরকার টু সরকার (জি–টু–জি) সহযোগিতা মডেল, প্রাইভেট সেক্টর বেনিফিট মডেল এবং লিমিটেড সাপোর্ট মডেল। এর মধ্যে প্রথম দুটি মডেলে ১১ শতাংশের বেশি অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার অর্জন সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সরকার–টু–সরকার সহযোগিতা মডেলকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই মডেলে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিক্রি করা হবে। নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ সেন্ট। এতে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ মুনাফা হার ১১ শতাংশের বেশি অর্জন সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সিটি কর্পোরেশনের সংগৃহীত বর্জ্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আমরা বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই। জাপানের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সম্ভাবনা সমীক্ষায় উঠে এসেছে, তা বাস্তবায়নে সিটি কর্পোরেশন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ–জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি, আর্থিক কাঠামো ও গ্যারান্টি সুবিধা নিশ্চিত হবে। এটি চট্টগ্রামকে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্ট–টু–এনার্জি সাফল্যের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
ডা. শাহাদাত বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেবল বিদ্যুৎ নয়, বরং একটি টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার অংশ। এতে একদিকে পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে উঠবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অবদান রাখা সম্ভব হবে।
সভায় জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উপদেষ্টা ইজি কোগা, জে এফ ই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গেন তাকাহাশি, কেন্টা ওহাশি ও ভাস্কর সাহা উপস্থিত ছিলেন। চসিকের পক্ষ থেকে প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) আবু সাদাত তৈয়ব, নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন রিফাত, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি, সহকারী প্রকৌশলী রুবেল চন্দ্র দাশ, সজীব রেজা হক, ইমরান হোছাইন খোকা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।












