এক বছরে ৬০ প্রাণহানি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই অংশে থামছে না মৃত্যুর মিছিল

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই | শনিবার , ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ

ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই অংশে সামপ্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরের পরিসংখ্যানে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের বছরেও প্রাণহানি ছিল অন্তত ৫০ জন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আরও শতাধিক মানুষ। টানা দুর্ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে; তারা সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।

সামপ্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে নিজামপুর এলাকায় স্ক্র্যাপবাহী ট্রাকের চাপায় এক পথচারী নিহত হন। জানুয়ারিতে বড়তাকিয়া, ধুমঘাট ও নিজামপুর এলাকায় পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত হন কয়েকজন, যাদের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও নৌবাহিনীর সদস্যও ছিলেন। একই মাসে স্ক্র্যাপবাহী ট্রাকের চাপায় গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আব্দুল মান্নান রানা।

জোরারগঞ্জ ও কুমিরা হাইওয়ে থানা, বারইয়ারহাট ও মীরসরাই ফায়ার সার্ভিস এবং গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৮৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। পরবর্তী পাঁচ মাসে আরও প্রায় ৫০টি দুর্ঘটনা যোগ হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮টি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭০টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল মালবাহী ট্রাক ও লরি; এসব ঘটনায় ১৫ জন চালক ও সহকারী নিহত হন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ১৫টি; এতে ১২ জন নিহত হন। সিএনজি টেক্সির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন ৪ জন। যাত্রীবাহী বাসের ৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ৫ জনের। রাস্তা পারাপার বা হাঁটার সময় নিহত হন ১১ জন পথচারী।

হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দক্ষিণে বড়দারগারহাট থেকে উত্তরে ধুমঘাট সেতু পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার এলাকায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। স্থানীয়দের কাছে এই অংশটি এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত।

জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোজাম্মেল জানান, ইউটার্নে যানবাহন থামানো, অবৈধ ট্রাকলরি পার্কিং, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত যান চলাচল, বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যএসবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে যানবাহনের সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সে অনুপাতে সড়ক অবকাঠামো সমপ্রসারণ হয়নি। বর্তমান সড়কটি যানবাহনের তুলনায় অত্যন্ত সংকীর্ণ; দ্রুত প্রশস্ত না করলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

বারইয়ারহাট ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, অনেক সময় সড়কে থেমে থাকা গাড়ির পেছনে দ্রুতগতির অন্য যান ধাক্কা দেয়। চালকের ক্লান্তি ও অসতর্কতাও বড় কারণ।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব প্রস্তুত রয়েছে। সরকারি অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নিয়মিত সড়ক মেরামত এবং চালকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের নিশ্চয়তা। কেবল মামলা নয়, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই পারে এই মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‘রুমে ঢুকে একদম ফুটবলের মতো লাথি দেব’
পরবর্তী নিবন্ধসাত ইউনিয়ন নিয়ে মাতামুহুরী উপজেলা গঠনপ্রক্রিয়া শুরু