বাংলা শিশুসাহিত্যের বরপুত্র এবং ছন্দের জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। তাঁর প্রয়াণে কেবল বড়ুয়া সমাজ নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। মৈত্রী, করুণা এবং অনাবিল হাসির যে দীপশিখা তিনি তাঁর ছড়াসাহিত্যের মাধ্যমে জ্বালিয়েছিলেন, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন এমন একজন স্রষ্টা, যিনি সাধারণ মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়কে অসামান্য রসবোধ ও ছন্দের অন্ত্যমিলে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ছড়ায় যেমন ছিল হাস্যরস, তেমনি ছিল সমাজ সংস্কারের তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত। বড়ুয়া সমপ্রদায়ের হাজার বছরের শান্তিবাদী দর্শন তাঁর জীবনবোধে ও লেখনীতে মিশে ছিল।
বৌদ্ধ কৃষ্টি ও বাঙালি সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন আমরা প্রাচীন সমতট বা পাল আমলের ইতিহাসে দেখি, সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন সেই ঐতিহ্যের একজন আধুনিক উত্তরসূরি। পণ্ডিত শীলভদ্র বা অতীশ দীপঙ্করের যে জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রা, সুকুমার বড়ুয়া সেই যাত্রাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর সহজ–সরল বাণীর মাধ্যমে। তাঁর সৃষ্টিতে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি এবং মানবতাবোধ সবসময় অগ্রগণ্য ছিল। গত ২০২৪ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ বাংলাদেশী বুড্ডিস্টস আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁকে যে সম্মাননা জানানো হয়েছিল, তা ছিল তাঁর কর্মের প্রতি একটি যথাযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সেই অনুষ্ঠানে সদ্য প্রয়াত আরেক মনীষী ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের উপস্থিতিতে চারণকবি সুকুমার বড়ুয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, তা আজ আমাদের কাছে পরম স্মৃতি হয়ে রইল। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড়ুয়াদের গর্ব ও পরিচয়ের প্রতীক।
সুকুমার বড়ুয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অলঙ্কার ছিল তাঁর অদম্য সারল্য। উচ্চমার্গীয় অহংবোধ তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এবং মাটির ঘ্রাণ নিয়ে সাহিত্য চর্চা করাই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বড়ুয়া জাতি কেবল বীর বা শাসকের জাতি নয়, এটি মূলত সৃষ্টিশীল এবং মরমী হৃদয়ের অধিকারীদের জাতি। সুকুমার বড়ুয়া শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বিড়াল’ কিংবা ‘চলছে গাড়ি ধপাধপ’ এর মতো সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আনন্দ দিয়ে যাবে। তাঁর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্মান। তিনি ছিলেন আমাদের বড়ুয়া জাতীয় সংহতির অন্যতম প্রাণপুরুষ। পরম করুণাময় বুদ্ধের চরণে তাঁর নির্বাণ সুখ কামনা করি।
লেখক : মহাসচিব ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ বাংলাদেশী বুড্ডিস্টস











