এক অনন্য প্রেসক্রিপশন

আমানুর রহমান | সোমবার , ১৬ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিনের ‘প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন’ কেবল একটি কাহিনির বই নয়, বরং আমাদের চারপাশের কঠোর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার একটি সাহসী প্রচেষ্টা। আধুনিক নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা, অশান্তি এবং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা অসঙ্গতিগুলো লেখক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টালে মনে হবে, এটি যেন আমাদেরই পরিচিত কোনো গলির কোণ, হাসপাতালের বারান্দা অথবা মধ্যবিত্তের খাবার টেবিলের না বলা গল্প।

বইটির নামগল্প ‘প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন’ আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার এক কালো অধ্যায়কে উন্মোচন করে, যেখানে ওষুধের জাদুকরী নামের আড়ালে বিপণন কৌশলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন। নাফিজের মতো হাজারো সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব এখানে এক তীব্র হাহাকার হয়ে বেজেছে। আবার ‘শিক্ষাক্ষেত্রে অঘোষিত শ্রেণিবিভাগ’ প্রবন্ধটিতে লেখক আমাদের তথাকথিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম প্রতিযোগিতার যে বিষবাষ্প তরুণদের মানসিক অবস্থাকে বিষিয়ে তুলছে, তার এক পরিষ্কার চিত্রায়ণ এখানে পাওয়া যায়। বইটির একটি মূল শক্তি হচ্ছে এর বৈচিত্র্য। একদিকে ‘প্রবাসের স্বপ্ন’ গল্পে হাজারো তরুণতরুণীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং আইইএলটিএস সেন্টারের নামে চলমান প্রতারণার কাহিনী উঠে এসেছে, অন্যদিকে ‘ধোঁয়ার শহর’ বা ‘হারিয়ে যাওয়ার পথে’ গল্পগুলোতে শহরের বিড়ম্বনা ও পরিবেশগত সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের পর্যবেক্ষণ এতটাই তীক্ষ্ম যে, রাজধানীর যানজট থেকে গ্যাসের সংকটসবকিছুই এখানে জীবনের সঙ্গে যুক্ত কাহিনী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে অন্ধকারের পাশাপাশি, ‘রক্তিম ভালোবাসা’এর মত গল্পে মানবিকতার উজ্জ্বল দিকও প্রকাশ পেয়েছে। রক্তদান সহ অন্যান্য ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে কীভাবে একটি জীবন রক্ষা করা সম্ভব, সেই ইতিবাচক বার্তাটি লেখক গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। আবার ‘শেখরের স্মৃতি’ বা ‘সাগরে মেজবান’ পাঠককে নস্টালজিক অনুভূতিতে প্রবেশ করায়, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক এবং উৎসবের শোভা ফুটে ওঠেছে।

ফিয়াদ নওশাদের লেখনী সহজবোধ্য কিন্তু অত্যন্ত ধারালো। কোনো কৃত্রিম অলংকারের মোহ ছাড়াই তিনি সমসাময়িক সংকটগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনমুখী গল্প যাদের পছন্দ এবং যারা সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন’ একটি আবশ্যিক পাঠ। এটি এমন এক বই, যা পড়ার পর পাঠককে দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ করে দেবে এবং নিজের চারপাশকে নতুন করে দেখতে শেখাবে। সময়ের সাহসী এই দলিলটি আমাদের বর্তমান প্রজন্মের মনস্তত্ব বোঝার জন্য এক অনন্য প্রেসক্রিপশন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধজ্যাকসন সি. ফ্রাঙ্ক: লোকসংগীতের এক ট্র্যাজিক কিংবদন্তির জীবন