চলতি মাসে একের পর এক ভূকম্পনে কেঁপে উঠেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নগরবাসী। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা ৩২ মিনিটে ৩ মাত্রার মৃদু কম্পন, ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৫১ মিনিটে ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি কম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক শক্তিশালী কম্পনগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল।
সাম্প্রতিক কম্পনগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না মিললেও অতীতের অভিজ্ঞতা নগরবাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরে পাঁচতলা ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১২টি ভবন কমবেশি হেলে পড়ে। গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে মনসুরাবাদ এলাকায় একটি ছয়তলা ভবন হেলে পড়ে। সর্বশেষ ২৫ ফেব্রুয়ারির কম্পনে বাদুরতলা জঙ্গিশাহ মাজার লেনের একটি সাড়ে সাততলা ভবনের একপাশে ফাটল সৃষ্টি হয়।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় প্লেট ও বার্মা (মিয়ানমার) প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। পৃথিবীর ভূ–পৃষ্ঠ সাতটি বড় টেকটোনিক প্লেট ও অসংখ্য ছোট সাব–প্লেট দিয়ে গঠিত। এসব প্লেটের সঞ্চালনের ফলে শিলাস্তরে ইলাস্টিক শক্তি জমা হয়। ধারণক্ষমতা অতিক্রম করলে ফল্ট লাইনের মাধ্যমে সেই শক্তি নির্গত হয়। তখনই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প। সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অঞ্চলটি একটি সক্রিয় টেকটোনিক জোন, যেখানে একটি প্লেট আরেকটির নিচে সরে যাচ্ছে (সাবডাকশন জোন)। ফলে চট্টগ্রাম ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে দেশের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
নগরায়নের ধরন ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নগরে মোট ভবনের সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি। এর মধ্যে একতলা ভবন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি, দুই থেকে পাঁচতলা ভবন ৯০ হাজার ৪৪৪টি, ৬ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন ১৩ হাজার ১৩৫টি এবং ১০ তলার উপরে ভবন রয়েছে ৫২৭টি। ২০ তলার বেশি ভবন রয়েছে অন্তত ১০টি। নগর পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই ভবনগুলোর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু ভবন নির্মাণে ইমারত বিধিমালা ও ভূমিকম্প সহনশীল নকশা যথাযথভাবে মানা হয়নি, যা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী। দেশের আমদানি–রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম, জ্বালানি সরবরাহ চেইন, শিল্পকারখানা ও পাহাড়ঘেরা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা–সব মিলিয়ে এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রভাব হতে পারে বহুমাত্রিক। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা আবাসন, নরম মাটি ও ভরাট এলাকায় নির্মিত উচ্চ ভবন, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এবং সরু সড়ক ব্যবস্থা উদ্ধার তৎপরতাকে জটিল করে তুলতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন, রেট্রোফিটিং (ভবন শক্তিশালীকরণ), বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে স্কুল–কলেজ, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিয়মিত মহড়া চালু রাখা জরুরি।
সাম্প্রতিক কম্পনগুলো বড় ক্ষয়ক্ষতি না ঘটালেও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতায় চট্টগ্রামের জন্য ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই পরিকল্পিত নগরায়ণ ও কঠোর তদারকিই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে।












