একুশ আমাদের অহংকার

তরুণ কান্তি বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ at ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ

একুশে ফেব্রুয়ারি তথা মাতৃভাষা দিবস বাঙালির জাতীয় জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিবস। বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গসহ বাংলা ভাষাভাষী জনগণের কাছে এটি একটি গৌরবোজ্জ্বল দিবস। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সুবিদিত। রক্তে রঞ্জিত এ দিনটি ভাষা আন্দোলনের সুচনা লগ্নে বাংলার

ইতিহাসে এক স্বর্ণালি মাইল ফলক হয়ে আছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব মুহূর্তে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড.জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পূর্ব বাংলা থেকে ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকে পূর্ব

বাংলার রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চালিয়ে দেবার হীন চক্রান্ত শুরু হয়।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে প্রথম বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও গ্রেফতার করা হয়। মূলত পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রথম গণ অভ্যুত্থান ভাষা আন্দোলনের সুচনা ঘটেছিল ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং এর চূড়ান্ত রূপ

নিয়েছিল ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার তুলনায় পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী জনগণ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু দু:খের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলার প্রাণের ভাষা বাংলা বারবার উপেক্ষিত হয়ে আসছিল। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মার্চ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল

কায়েদই আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেন ‘উর্দু, এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’। এরপর আবারো ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময়ও তিনি একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জিন্নাহর ঘোষণার প্রতিবাদে তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সহস্র জনতার কণ্ঠের না না ধ্বনিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠান প্রকম্পিত হয়ে উঠে। বাংলা ভাষার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে এবং একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেবার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন

গড়ে তোলার লক্ষ্যে তমুদ্দন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালিত হয় এবং ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আনাচে কানাচে সর্বস্তরের মানুষের মুখে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’

স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। পাকিস্তান সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করলে, বাহান্নের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলার অকুতোভয় সংগ্রামী জনগণ ও ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখে গিয়ে পৌঁছলে পুলিশ

নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। বেপরোয়া গুলিবর্ষণে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, শফিউর ও জব্বারসহ অনেক তরুণ অকালেই ঝরে যায়। পুলিশের বর্বরোচিত নৃশংসতার প্রতিবাদে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রাজপথে নেমে আসে। এরই প্রেক্ষাপটে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা

সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘ভাষা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পাক সরকার বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। বাহান্নের রক্তঝরা দিনগুলোকে স্মরণে রেখে সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, নাট্যকার তাঁদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে

বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানান। ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ ১ম কবিতা নিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন চট্টগ্রামের অন্যতম কৃতী সন্তান কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। ‘ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গান নিয়ে সংগ্রামের সাথে একাত্বতা প্রকাশ

করেছিলেন ভাষা সৈনিক গাজীউল হক। আসলে বাহান্নের ভাষা আন্দোলন এ দেশের কবিসাহিত্যিকদের করেছে তুমুল আলোড়িত। তাঁরা লেখনীর মাধ্যমে আন্দোলনকে করেছেন বেগবান।

ভাষা দিবসের তাৎপর্য উল্লেখ করে ভাষা বিজ্ঞানী ড.হুমায়ুন আজাদ বলেছেন ‘আমি মুগ্ধ, আমি প্রীত, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের কথা আমার ভাষায় জানতে পারব বলে আমার হৃদয় স্পন্দন বেড়েছে। সত্যিই গর্বিত আমি’। বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ম উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন

কালজয়ী উপন্যাসিক জহির রায়হান। প্রথম নাটক ‘কবর’ রচনা করেন প্রফেসর মুনীর চৌধুরী। পরিচালক জহির রায়হান রচিত প্রথম চলচিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ভাষার স্মৃতিকে অম্লান রেখে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তি যুদ্ধে অনি:শেষ প্রেরণা যুগিয়েছিল।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিনারটি নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ৫৬ এর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ আউয়াল নামক এক রিঙা চালকের ৬ বছর বয়সী কন্যা বসিরন এবং

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দেই প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ঘোষণা করা হয়।

একুশের ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই বাঙালির স্বাধীনতার মূলমন্ত্র নিহিত ছিল। বাঙালির আত্ম পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অনুপ্রেরণা ছিল একুশের চেতনা। একুশের চেতনাকে সামনে রেখে পরবর্তীতে বাঙালির জীবনে ঘটে থাকে ১৯৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন

এবং সর্বশেষ ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ। বাঙালির স্বাধীনতার মূলমন্ত্র একুশের ভাষা আন্দোলনে নিহিত ছিল বিধায় আমাদের জাতীয় জীবনের সকল আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতার মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একুশের ভাষা

আন্দোলন বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলেও এ লড়াইয়ে আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র নিহিত ছিল। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার সফল সংগ্রাম ছিল এ ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলন বাঙালিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ভাষার ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

এরই ফলশ্রুতিতে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি ৭১এর ২৬ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়েছিল। বাহান্নের ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে

বাঙালি জাতি দেশকে হানাদার মুক্ত করে লাল সবুজের পতাকা বুকে নিয়ে বাংলাদেশের মহান বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বাহান্নের একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার জন্য অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতি এবং শহীদ স্মৃতিকে সারাবিশ্বে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এর

সাধারণ পরিষদের ৩০ তম অধিবেশনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৭ টি দেশের সমর্থনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সর্বসম্মতভাবে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সারাবিশ্বে প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালিত হয়। মহান একুশ

আমাদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা জোগায়। একুশের চেতনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রেরণা। একুশ আমাদের অহংকার।

লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশুদ্ধ বাংলা চর্চায় সচেতন হওয়া জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধচিরায়ত বাংলার শাশ্বত চেতনা ও অমর একুশ