স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একটা আশা জাগানিয়া পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও জহির রহমান নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত এই ঘটনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে অপূরণীয় ক্ষতি সৃষ্টি করেছিল যার মন্দ, প্রভাব আজও অব্যাহত। তবুও অনেক নবীন পরিচালক এগিয়ে এসেছিলেন স্বাধীনতার পরপর; যেমন আলমগীর কবির, কবীর আনোয়ার, চাষী নজরুল ইসলাম, আনোয়ার আশরাফ, খসরু নোমান, আবদুল্লাহ আল মামুন, সি বি জামানসহ আরও কয়েকজন। তেমনই মূলধারার প্রবীণ পরিচালকেরাও ভিন্ন ধরনের ছবি পরচালনায় উদ্যোগী হন; যেমন সুভাষ দত্ত, নারায়ন ঘোষ মিতা, খান আতাউর রহমান, বাবুল চৌধুরী, আমজাদ হোসেন, মোস্তফা মেহমুদ, রহীম নেওয়াজ, রুহুল আমীন, সৈয়দ হাসান ইমাম (তিনি অবশ্য স্বাধীনতার পূর্বে পরিচালনায় আসেননি), বেবী ইসলামসহ বেশ কয়েকজন। উভয় প্রজন্মের পরিচালকদের উদ্যোগে বেশ কিছু মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই এসেছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক ও রাজেন তরফদার। তৈরি করেছিলেন দু’টি মাস্টারপিস; তিতাস একটি নদীর নাম ও পালঙ্ক।
কয়েকবছর পরেই আসেন মসিহউদ্দিন শাকের, শেখ নিয়ামত আলী, বাদল রইমান, সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী। তৈরি হয় বেশ কয়েকটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র যার মধ্যে ছিল সূর্য দীঘল বাড়ি স্বাধীনতার পর আশাব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পায় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা, শিল্পী কলাকুশলীর সংখ্যা, ছবির সংখ্যা। প্রবর্তিত হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, অনুদান প্রথা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সিনেমা একটি জমজমাট ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়ে উঠেছিল যেখানে লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানও গড়ে উঠেছিল সারাদেশ জুড়ে। দেশের চলচ্চিত্র সাংসদ আন্দোলনও সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পরের দশকগুলিতে। অনুষ্ঠিত হয় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। বিকল্প ধারার একটি শক্তিশালী স্রোত তৈরি হয়। এই ধারায় আবির্ভুত হন অনেক মেধাবী চলচ্চিত্রকার।
কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের লিখন, এই সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হতে শুরু করে ১৯৮৫–এর পর থেকে। তখন রাজনৈতিক অরাজকতা চলছিল দেশ জুড়ে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মূলধারাটি এক কথায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন বিকল্প ও স্বাধীন ধারায় কিছু ছবি নির্মিত হচ্ছে। এর কিছু কিছু পুরস্কৃতও হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। এভাবেই টিমটিম করে বাংলাদেশের সিনেমার প্রদীপ জ্বলছে।
এত দীর্ঘ প্রসঙ্গের অবতারণা একটি সুসংবাদকে ঘিরে। চিত্রনায়িকা ববিতার একুশে পদক প্রাপ্তি। ২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্যে তিনি মনোনীত হয়েছেন চলচ্চিত্র বিভাগে। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের জন্যে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করা হলেও একুশে ও স্বাধীনতা পদকে চলচ্চিত্রের কোনো কদর নেই। এ বিষয়ের কোনো বিভাগ মনে হয় নেই। কালেভদ্রে দুয়েকজন এই বিভাগে পদক অর্জন করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সেখানে আজীবন সম্মাননার ব্যবস্থা থাকলেও, দেশের সর্বোচ্চ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এ দু’টি পদকের সম্মান ও মূল্য অবশ্যই অপরিসীম এবং স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। যদিও মাঝে মধ্যে এ দু’টি পদক রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।
ফরিদা আখতার পপি-(ববিতা) চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের জন্যে এবারে একুশে পদক পেলেন যা গৌরবান্বিত করেছে তাঁকে এবং এদেশের চলচ্চিত্রকেও। ববিতা সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাভিনেত্রী। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করতে পারার সৌভাগ্য বাংলাদেশে একমাত্র তাঁরই। আর এই সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটেনি। সারা বিশ্বের প্রথিতযশা শিল্পীরা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে থাকতেন। স্বভাবতই সবার সে সুযোগ হয়নি। সেক্ষেত্রে ববিতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সত্যজিৎ তাঁর অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয়ের জন্যে নিয়ে গিয়েছিলেন যা ববিতার জন্যে গৌরবের বিষয়। অশনি সংকেত ছবিতে ববিতা অভিনীত অনঙ্গ বৌ চরিত্রটি ছিল পুরো ছবির ভরকেন্দ্র। প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ববিতার সাবলীল উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এ ছবিতে তিনি তাঁর জীবনের সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনা অবলম্বনে ১৯৭৩ সালে।
বাংলাদেশে একসময় দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির সমন্বয়ে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত হতো, যেগুলি প্রদর্শিত হতো সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে। এই সূত্র ধরে এসব ছবির শিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলীরা নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক বলে দাবী করতেন। যেহেতু জাতীয় স্তরের বাইরে তারা কাজ করেছেন। কিছু প্রকৃত অর্থে এটা কতটুকু আন্তর্জাতিক দাবির যোগ্য সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষে।
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র মাত্রই আন্তর্জাতিক। কেননা তাঁর ছবিগুলি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত সমাদৃত ও পুরস্কৃত হতো। বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দেশগুলিতে। অশনি সংকেতের বেলাতেও তাই হয়েছিল এবং ছবিটি বার্লিনসহ বিভিন্ন উৎসবে পুরস্কৃত হয়। ববিতা বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছবিটির প্রদর্শনী ও পুরস্কারপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে গ্রন্থ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র পত্রিকার প্রচ্ছদে ববিতার (অশনি সংকেতের স্থিরচিত্র) ছবি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সব মিলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাভিনেত্রী এবং সত্যজিৎরায়ের ছবির নায়িকা হিসেবে ববিতার যথেষ্ট আন্তর্জাতিক পরিচিত রয়েছে। অশনি সংকেত ছবিতে ববিতা অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টেপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, গোবিদ চক্রবর্তীর মতো জাঁদরেল অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে যা তাঁর অভিনয়কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অশনি সংকেতে তিনি যখন অভিনয় করেন তখন তাঁর শিল্পীজীবন মাত্র চার বছরের। বলতে গেলে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের সান্নিধ্য পেয়ে যান যা তাঁর পরবর্তী ক্যারিয়ারকে অগ্রবর্তিতা এনে দেয় এবং অভিনয়কে শানিত করে। কিছু কিছু ম্যানারিজম তাঁর অভিনয়ে পরিলক্ষিত হতো মূলধারার চলচ্চিত্রে। তবে ভিন্ন ধরনের ছবিতে অভিনয়ের সময় তিনি এসব ম্যানারিজম পরিহার করে মেথড অভিনয় উপহার দিতে জানতেন।
ববিতার চলচ্চিত্রাগমনও আরেক জাঁদরেল চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের হাত ধরে ১৯৬৮ সালে ‘সংসার’ ছবির মধ্য দিয়ে। এ ছবিতে তিনি সুবর্ণা নামে কিশোরী অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেন সাজ্জাদের বিপরীতে। পরের বছর ১৯৬৯ সালে নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম পদার্পন নুরুল বাচ্চু পরিচালিত ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিতে জহির রায়হানের প্রযোজনায় রাজ্জাকের বিপরীতে। সেই পথচলা অব্যাহত রয়েছে দশকের পর দশক। এখন অবসরে থাকলেও ভালো চরিত্র পেয়ে এখনও অভিনয়ে আগ্রহী তিনি জহির রায়হানের অসমাপ্ত বহুভাষিক চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’–এর নায়িকা চরিত্রেও ববিতা অভিনয় করছিলেন। ছবিটি সম্পূর্ণ হয়ে মুক্তি পেলে অশনি সংকেতের পাশাপাশি এটিও হতো তাঁর আরেকটি মাইলস্টোন।
হার্ডকোর মেইনস্ট্রিম ছবির পাশাপশি শিল্পধর্মী বিকল্পধারার ছবিতেও ববিতা ছিলেন অপরিহার্য। তেমনই মেইনস্ট্রিম পর্যায়ের অফট্র্যাক ছবিতেও তাঁর সমান অপরিহার্যতা ছিল। উদাহরণ হিসেবে শ্লোগান, অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আলোর মিছিল, ধীরে বহে মেঘনা, লাঠিয়াল, নয়নমনি, বসুন্ধরা, গোলাপী এখন ট্রেনে, ডুমুরের ফুল, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দহন, দীপু নাম্বার টু, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, প্রভৃতি ছবি উল্লেখযোগ্য। এসব ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে তিনি নির্দেশক হিসেবে পেয়েছেন সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আলমগীর কবির, কবির আনোয়ার, আমজাদ হোসেন, শেখ নিয়ামত আলী, মোরশেদুল ইসলাম, আখতারুজ্জামান প্রমুখ মেধাবী ও শীর্ষস্থানীয় পরিচালকদের।
পরপর তিনবারসহ মোট আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী ববিতার জন্ম ১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা পিতা নিজাম উদ্দিন আতাউরের কর্মস্থলে বাগেরহাট শহরে। মাতা জাহানারা বেগম ছিলেন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। উচ্চশিক্ষিত পরিবারটির আদিনিবাস যশোরে। ববিতার বড়বোন কোহিনুর আক্তার সুচন্দা এবং ছোটবোন গুলশান আর চম্পা দুজনেই সুঅভিনেত্রী। ভাইদের তিনজনেই উচ্চ শিক্ষিত। জহির রায়হান তাঁর জ্যেষ্ঠ ভগ্নিপতি। ববিতার অকালপ্রয়াত স্বামী ইফতেখারুল আলম ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তাঁদের একমাত্র সন্তানপুত্র অনিক ইসলাম ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় প্রবাসী। শিল্পী এবং ব্যক্তিজীবন দু’দিকেই সফল আমাদের শ্রদ্ধাভাজন এই প্রথিতযশা শিল্পীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানপ্রাপ্তিতে আমাদের অকুন্ঠ অভিনন্দন ও শুভকামনা।










