ফাল্গুনের বিকেলটা আজ কেমন যেন ভারী। আকাশে রোদ আছে, তবু মনে হয় কোথাও কোনো অদৃশ্য মেঘ বুকের ওপর বসে আছে। ঢাকার বাতাসে ফুলের গন্ধ, আর গন্ধের ভেতর মিশে আছে ইতিহাসের পুরোনো কান্না।
জিনান, সিয়াম, সায়েম আর তামিম হাঁটছিল শহীদ মিনারের দিকে। তাদের সঙ্গে ছোট্ট দুই বন্ধু আফরিন আর আফরা। আফরার হাতে ছিল গাঁদার মালা, আফরিনের হাতে কয়েকটি গোলাপ।
আফরা বলল,
–আজ এত মানুষ ফুল নিয়ে যাচ্ছে কেন?
তামিম একটু গম্ভীর হয়ে বললো,
–আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ ভাষার দিন।
আফরিন চোখ বড় করে বলল,
–ভাষার দিন মানে?
জিনান একটু থেমে গিয়ে বলল,
–ভাষার দিন মানে, যেদিন মানুষ বাংলা ভাষার জন্য বুক জীবন দিয়েছিলো।
সিয়াম ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করল আরও কিছু রজনীগন্ধা। ধীরে ধীরে বলল,
–এই ফুলগুলো শুধু ফুল না, আজ এগুলো শ্রদ্ধা।
আফরা একটু চুপ করে গেল। তারপর খুব ছোট গলায় বলল,
– আব্বু আজ সকালে খুব চুপচাপ ছিল এমনকি আমাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কিছু বলেনি।
সায়েম অবাক হয়ে তাকাল।
–তোমার আব্বু কি একুশ নিয়ে কিছু বলে না?
আফরা মাথা নাড়ল।
–না। শুধু রাতে ঘুমানোর আগে একটা পুরোনো বাক্স খুলে দেখছিল। আমি দেখেছি আব্বুর চোখে পানি ছিল।
এই কথাটা শোনার পর তারা সবাই এক মুহূর্ত থমকে গেল। বাতাসটা যেন আরও ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
শহীদ মিনারে পৌঁছে তারা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মানুষের ঢল, কিন্তু সবার মুখ নত। কেউ হাসছে না, কেউ চিৎকার করছে না। শুধু ফুলের স্তূপ আর স্তূপ। লাল, সাদা, হলুদ ফুলে শহীদ মিনারের বেদি যেন রঙিন কবরস্থান।
দূরে ভেসে আসছিল গান
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’
তামিম প্রথমে খালি পায়ে এগিয়ে গিয়ে ফুল রাখল। তারপর জিনান, সায়েম, সিয়াম। শেষে আফরিন আর আফরা ধীরে ধীরে সামনে গেল। আফরা যখন গাঁদার মালা রাখল, তার হাত কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল সে কোনো অদৃশ্য মানুষের কপালে হাত রেখে আশীর্বাদ দিচ্ছে।
হঠাৎ আফরার চোখ পড়ল এক কোণায় পড়ে থাকা একটা পুরোনো, ধুলো মাখা খাতা। দেখতে ডায়েরির মতো। বৃষ্টিতে ভেজা কাগজ, কিছু পাতা ছেঁড়া, তবু বাঁধাইটা অক্ষত। কেই হয়তো রেখে গেছে।
আফরা কৌতূহল নিয়ে তুলে নিল।
–এটা কার?
জিনান দ্রুত খাতাটা হাতে নিল। মলাটের ওপর অস্পষ্ট হাতে লেখা
‘ডায়েরি–১৯৫২’
সবার দম বন্ধ হয়ে এলো।
তামিম ফিসফিস করে বলল,
–অসম্ভব!
সিয়াম চোখ বড় করে বলল,
–এটা কি সত্যি ?
ডায়েরির পাতা খুলতেই ভেতরে পুরোনো কালি, পুরোনো হাতের লেখা। জিনান পড়তে শুরু করল। তার গলা কাঁপছিল।
‘২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
আজ আমাদের মিছিলে নামতে হবে।
আম্মা বলেছে যেয়ো না।
কিন্তু বাংলা ভাষা কি শুধু শব্দ?
না, বাংলা আমার মায়ের মুখ, আমার দেশের বুক।’
আফরিন বিস্ময়ে বলল,
–এটা তো সত্যি গল্প!
সায়েম নিচু স্বরে বলল,
–না আফরিন এটা ইতিহাস।
জিনান পরের লাইন পড়ল–
“পুলিশ বলেছে মিছিল করলে গুলি করবে।
আমরা ভয় পাই, কিন্তু ভয় পেলে চলবে না ।
কারণ আমরা যদি না দাঁড়াই, বাংলা কাঁদবে।”
আফরার বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল। তার মনে হচ্ছিল ডায়েরির প্রতিটি অক্ষর যেন জীবন্ত হয়ে যাচ্ছে।
জিনান হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল এক জায়গায়। তারপর সে ধীরে ধীরে পড়ল–
‘আমি যদি ফিরে না আসি,
তোমরা সবাইকে বলবে–
বাংলাকে যেনো কখনো ভুলে না যায়।’
জিনান ডায়েরির শেষ পাতা খুলে ফেলল। সেখানে একটা ছবি ছিল– কালো–সাদা। এক তরুণ, চোখে সাহস, ঠোঁটে মৃদু হাসি। ছবির নিচে লেখা–
‘ভাষার জন্য জীবন দিতে পারলে, মৃত্যু ভয়ের নয়।’
আফরা কাঁদতে শুরু করল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে থামাতে পারছে না।
–এটা এটা আমার দাদুর ছবি আমি আব্বুর ঘরে দেখেছি!
সিয়ামের বুকটা ভারী হয়ে উঠল। সে বলল,
–তোমার দাদু তাহলে একুশের মিছিলে ছিলেন!
জিনান নরম গলায় বলল,
–হয়তো শহীদ না হয় ভাষাসংগ্রামী। কিন্তু তিনি ছিলেন ইতিহাসের অংশ।
সন্ধ্যা নেমে এলো। শহীদ মিনারে আলো জ্বলে উঠল। ডায়েরিটা আফরার বুকের কাছে চেপে ধরা। মনে হচ্ছিল সে কোনো হারানো রক্তের উত্তরাধিকার হাতে পেয়েছে।
আফরা চোখ মুছে বলল,
–আমি আব্বুকে এটা দেখাব। আব্বু চুপচাপ থাকত কেন বুঝতে পারছি আব্বু আজ কাঁদছিল দাদুর জন্য।
তামিম বলল,
–এ ডায়েরি শুধু তোমার না আফরা এটা আমাদের সবার।
সিয়াম মাথা নোয়াল।
কারণ ভাষা আমাদের সবার।
জিনান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
–একুশ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়। একুশ মানে ভাষাকে ভালোবাসা, ভাষাকে আগলে রাখা।






