১.
মহাদেব পুর গ্রাম। শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। একটি অজ পাড়া গ্রাম। এককালে মির্জা পরিবার এখানেই থাকত, কিন্তু কালের বিবর্তনে সে সব আজ রূপকথা।
গ্রামের শেষ মাথায় যেখানে ছোট ছোট পাহাড়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। ঝোপঝাড়, বুনো লতা পাতা আর শ্যাওলা, যেন বন্য এক দানবীয় হা দিয়ে বাড়িটাকে গিলে খেয়েছে। বাড়ির গায়ে বটগাছের শিকড়গুলো এমনভাবে বসে গেছে, যেন কোনো প্রাচীন কঙ্কাল তার দীর্ঘ নখ দিয়ে দেয়ালটাকে খামচে ধরে আছে।
হামিদ মির্জা যখন ধুলোবালি আর ঘাস মাড়িয়ে সেই বাড়ির গেটে এসে দাঁড়াল, তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামছে। তার বুকের ভেতর এক অস্থিরতা। বহু বছর পর সে তার আদি ভিটায় পা রেখেছে। এক রহস্যের সন্ধানে। বাড়ির ঠিক দক্ষিণ কোণে একটা ছোট কবরস্থান। চার–পাঁচটি পুরনো কবর। শুকনো পাতার মচমচে শব্দ ছাড়া সেখানে আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যেন চারিদিকের বাতাসকে ভারী করে রেখেছে।
২.
হামিদ মির্জার বাবার শেষ উইল অনুযায়ী, এই বাড়ির একটি বিশেষ কক্ষের চাবি তাকে দেওয়া হয়েছিল। উইলটা ছিল অদ্ভুত রকমের। সেখানে লেখা ছিল, ‘হামিদ, আমাদের ওই আদি ভিটার উত্তর–পশ্চিম কোণের ঘরটা কখন ভাঙিস না। ওটা আমাদের বংশের পবিত্র আমানত। সময় হলে ওটার দরজা খুলিস।’
হামিদ মির্জা যখন সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তার হাতে তখন পুরনো একটি চাবি। সেই চাবি দিয়ে দরজার পুরানো তালাটা খুললো। দরজার পাল্লার কাঠ রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার ফলে দরজার কব্জাগুলোও মরচে পড়ে জ্যাম হয়ে আছে। অনেক কষ্ট করে, নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে এক অদ্ভুদ ভ্যাপসা গন্ধ আর কয়েক দশকের বন্দি বাতাস হামিদ মির্জার চোখে–মুখে ঝাপটা দিল।
৩.
ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই হামিদ মির্জার শরীর গিজ গিজ করে উঠল। ঘরের মেঝেতে পুরু ধুলার আস্তরণ। কোণে কোণে মাকড়সার বিশাল জাল। কিন্তু জানালার ভাঙা কাচ দিয়ে এক টুকরো রোদ যখন ঘরের মাঝখানে পড়ল, হামিদ মির্জা থমকে গেল। সে তখন যা দেখল, তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
ঘরের ঠিক মাঝখানে ইটের পর ইট গেঁথে তৈরি করা হয়েছে একটি ছোট্ট শহীদ মিনার। শহিদ মিনারটি আধুনিক কোনো মার্বেল পাথরের নয়, বরং সাধারণ পোড়ামাটির লাল ইট আর চুন–সুরকির প্লাস্টার দিয়ে তৈরী। উচ্চতা বড়জোর সাড়ে তিন বা চার ফুট হবে। কিন্তু তার মাঝে রয়েছে এক ধরণের মায়াবী হাতের ছোঁয়া।
মিনারটির স্তম্ভগুলোর ওপর ধুলোর আস্তর পড়লেও এর লাল রঙটা যেন এখনও জীবন্ত। হামিদ মির্জা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বসে পড়ল। তার মনে প্রশ্ন জাগল, ১৯৫২ সালের সেই উত্তাল সময়ে, যখন একুশের আন্দোলনের ঢেউ ঢাকার রাজপথ কাঁপাচ্ছিল, তখন এই অজ পাড়াগাঁয়ের এক অন্ধকার ঘরে বসে কে গড়েছিল এই মিনার?
৪.
মিনারটির বেদির একপাশে একটি ছোট্ট লোহার বাক্স যত্ন করে রাখা ছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা খুলতেই পাওয়া গেল একটি হলুদ খামের চিঠি। চিঠিটি তার দাদা মরহুম আশরাফ মির্জার ছোট ভাই, সলিম মির্জার। ১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সলিম মির্জা লিখেছিলেন, ‘ভাইজান, ঢাকা আজ মিছিলে মিছিলে উত্তাল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরা রাজপথে আছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওপর কড়া নজরদারি বাড়িয়েছে। আমি হয়তো বেশিদিন বাইরে থাকতে পারব না। যদি পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়, তবে আমি গ্রামে ফিরে যাব। আমাদের গ্রামের বাড়িতে থাকবো। বাড়ির একটি নির্জন কক্ষে আমি আমার প্রাণের ভাষার এক স্মৃতি গড়ে রাখবো। ওটা আমার বিদ্রোহ, ওটাই আমার ভালোবাসা।’
হামিদ মির্জা বুঝতে পারল, বাড়ির পাশের ওই নামহীন কবরগুলোর একটি হয়তো সলিম মির্জার। সে হয়তো ঢাকা থেকে পালিয়ে এসে গোপনে এই বাড়িতে ছিলেন। এই শহিদ মিনার তিনি তৈরি করেছিলেন। এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ঘরের ভেতর নিজের ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে গেছেন। গ্রামের লোকজন জানত যে, এটা একটা পরিত্যক্ত ঘর। কিন্তু এই দেয়ালের ভেতরে যে এক বিশাল আবেগ জমা ছিল, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
৫.
হামিদ মির্জা হলুদ খামটা নিয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশ তখন গোধূলির লাল রঙে একাকার হয়ে গেছে। সেই রক্তিম আভা যেন শহীদ মিনারের বেদির রক্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। হামিদের মনে হলো, সেই রক্তের শান্ত শক্তি তাকে এক নতুন পথ দেখাচ্ছে। সে একজন স্থপতি হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল শহরে, কিন্তু আজ এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে তার সব পরিকল্পনা বদলে গেল।
সেদিন ছিল ২০শে ফেব্রুয়ারি। পরের দিন একুশ। সে স্থানীয় কিছু তরুণকে ডেকে আনল। গ্রামবাসী প্রথমে অবাক হলেও হামিদ মির্জার চোখের কষ্ট দেখে তারা এগিয়ে এলো। সারা রাত ধরে চলল ঘর পরিষ্কারের কাজ। ঝোপঝাড় কাটা হলো। শহিদ মিনারটির উপর জমে থাকা ধুলো ময়লার জঞ্জাল পরিষ্কার করা হলো।
৬.
২১ শে ফেব্রুয়ারির ভোরে যখন অন্ধকার গ্রামে প্রথম সূর্যের আলো ফুটল, তখন দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। মির্জা বাড়ির সেই ‘ভুতুড়ে’ বাড়িটি আজ আর অভিশপ্ত নেই। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বুনো ফুল, রক্তজবা আর গাঁদা সংগ্রহ করে এনেছে। হামিদের নেতৃত্বে তারা লাইন ধরে গিয়ে দাঁড়াল সেই গোপন ঘরের সামনে।
হামিদ যখন সেই ছোট্ট শহীদ মিনারের বেদিতে প্রথম ফুলের তোড়াটি রাখল, তখন তার মনে হলো সলিম মির্জার অতৃপ্ত আত্মা যেন শান্ত হলো। গ্রামবাসীর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো– ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…’।
আজ এক অজ গ্রামের পরিত্যক্ত ঘরেই উদযাপিত হলো ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল একুশ।
৭.
হামিদ মির্জা শহিদ মিনারের বেদিতে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, ‘দাদা, আমরা আপনাদের ভুলিনি। আপনার আমানত একুশের গুপ্তধন আজ আমাদের বুকের ভিতরে সসম্মানে মুক্ত হলো।’
হামিদ মির্জার চোখের এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু শহিদ মিনারের মেঝেতে পড়তেই যেন কয়েক দশকের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক মুঠো পরম শান্তি নেমে এল। সলিম মির্জার আত্মা সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে হামিদের এই বিনম্র শ্রদ্ধা গ্রহণ করল।
একুশের এই প্রথম প্রভাতে হামিদ মির্জা অনুভব করল, রক্ত আর বর্ণমালার এই মিলন পৃথিবীর কোনো দূরত্ব বা সময় দিয়েই মুছে ফেলা যায় না। সে মনে মনে শপথ নিল, এই পরিত্যক্ত ভিটেতেই গড়ে তুলবে একুশের এক অমর যাদুঘর, যেখানে প্রতিটি ইট– বালু কথা বলবে। প্রতিটি ক্ষুদ্রকণা গাইবে বিজয়ের গান।








