অনীকের যখন থেকে বোঝার মতো বয়স হয়েছে তখন থেকেই দেখে আসছে তার ছোটকা একুশে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে আল্পনা আঁকে, সংগে থাকে এক দঙ্গল সৌখিন আঁকিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারির কয়েকদিন আগে থেকেই ছোটকার ব্যস্ততা তার নজর এড়াতো না। সে অনেকবার মনে মনে ভেবেছে ছোটকার সাথে সেও একুশের আল্পনা আঁকবে, কিন্তু বাবার রক্তচক্ষুর ভয়ে সাহসে কুলোয়নি।
অনীক এখন হাই স্কুলের ছাত্র,খুদে আঁকিয়ে হিসাবে ইতোমধ্যে শহরে তার নামডাকও হয়েছে।বেশ কিছু পুরস্কারও ইতোমধ্যে তার ঝুলিতে পুরেছে।
গত ক’দিন ধরে অনীক ভাবছে এবার সে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে রাস্তায় আল্পনা আঁকবে। মায়ের অনুমতি নিয়েই সে কাজটা করবে, মাকে দায়িত্ব দেবে বাবাকে ম্যানেজ করার জন্য। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সেদিন খাবার টেবিলে মায়ের কাছে সে কথাটা পাড়ে।
মা , একটা কথা বলবো ?
বল।
আমি এবার ছোটকার সাথে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে রাস্তায় আল্পনা আঁকতে চাই, তুমি অমত করবে না তো?
না, না অমত করবো কেন?
বাবাকে তুমি ম্যানেজ করো।
ঠিক আছে।
খাবারের পাট চুকিয়ে অনীক ছোটকার ঘরের দরজার কড়া নাড়ে।
কে?
ছোটকা আমি, ফ্রি আছো?
হ্যাঁ। আয়, ভেতরে আয়।
তোমাকে একটা কথা বলবো?
বল।
আমি এবার তোমার সাথে একুশের আল্পনা আঁকবো।
তাই! ছোটকা শোয়া থেকে উঠে বসে।
হ্যাঁ ।
দাদা, বৌদি পারমিশন দেবে?
আমি কী অতো কাঁচা কাজ করি? ঊনাদের পারমিশন নিয়েই তো তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।
তাহলে ঠিক আছে।
আমি আল্পনার কয়েকটি ডিজাইন ঠিক করে তোমার সাথে বসবো।
তথাস্তু।
অনীক নিজের ঘরে এসে দরজায় খিল দেয়, উত্তেজনায় সে টগবগিয়ে ফুটতে থাকে।ল্যাপটপটা নিয়ে সে টেবিলে বসে পড়ে, গুগল সার্চ করে বেশ কয়েকটা আল্পনার ডিজাইন সে নির্বাচিত করে।পরদিন সে ছোটকার সাথে ডিজাইনগুলো নিয়ে আলাপ করে, ছোটকা তাতে কিছুটা অদল বদল করে দেয়।
গত ক’দিন ধরে অনীক ইউটিউবে বায়ান্নর একুশের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত বিভিন্ন তথ্যচিত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।মহান একুশের ইতিহাস যদিও অনীকের আগে থেকেই জানা আছে, তারপরও সে আবার ভালো করে ঝালিয়ে নেয়।
বিশ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা একটু জাঁকিয়ে নামতেই অনীক ছোটকার সাথে পথে নামে। তারা দু’দিন আগেই স্পটগুলো রেকি করে এসেছিল।নির্ধারিত স্পটে পৌঁছেই অনীকরা কাজে লেগে যায়। রাস্তার কালো পিচে তুলির প্রথম আঁচড় দিতেই উত্তেজনায় অনীকের হাত কাঁপতে থাকে, নিজেকে সে সামলে নিয়ে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে থাকে মহান একুশের আল্পনা।ছোটকা এসে মাঝে মধ্যে চোখ বুলোয়, দারুন আঁকছিস– বলে মাথায় চাটি মারে।
ছোটকার অনুপ্রেরনায় অনীকের কাজের উৎসাহ দ্বিগুন বেড়ে যায়। তার নিপুন হাতের তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে একুশের আল্পনা।একটু তফাতে আইপডে বাজতে থাকে অমর সেই গান– ‘ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।








