১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ হতে ১৬ই ডিসেম্বর চাক্ষুষ ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণ করছি এই লেখায়। আমি তখন কিশোরবেলার স্বপ্নচারী। মাধ্যমিক স্কুলে পড়ি। একাত্তরের ২৫ শে মার্চের কালরাত্রিতে গুডুম গুডুম তীব্র আওয়াজ শুরু হয়; কেউ কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই আমরা খাটের নিচে লম্বালম্বিভাবে শুয়ে পড়ি। স্থান চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানাধীন আফগান মসজিদের সম্মুখে কধুরখীল নিবাসী মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাঁচা/পাকা মিশ্রিত টিনের ছানির গৃহগুলি। বাড়িওয়ালা মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের একমাত্র কন্যাও আমার সমশ্রেণির ছাত্রী ছিল। বাড়িওয়ালার একতলা বিল্ডিং এবং ভাড়াটিয়াদের গৃহগুলি ছিল টিনসেড সেমিপাকা। আমরা ৩ ভাই বোনসহ অপর ভাড়াটিয়া শিক্ষকের মেয়েরা এবং মোস্তাফিজুর রহমান চাচুর স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে আমরা সবাই কয়েকটা রুমে জড়ো হয়ে আছি। মেয়ে ও মহিলা এক রুমে এবং ছেলেরা অন্য রুমে। সব দরজা–জানালা বন্ধ, কানে তুলা ঢুকানো হল। কিন্তু আওয়াজ কমে না। ফজরের আজানের সময় সবাই বের হয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করলাম, ফজরের নামাজ আদায় করলাম। সময় বেলা বারোটা। কিন্তু আওয়াজ বন্ধ হয়নি। চট্টগ্রাম বেতারের সংবাদ টিউন করার চেষ্টা করলেন বড়োরা। কিন্তু কোন লাভ হল না। সকাল ৭ টার সময় চট্টগ্রাম বেতারের খবর শুনতাম কিন্তু ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সকাল ৭টার সংবাদ আমি বা আমরা কেউ শুনতে পাইনি। একটি বিভিষীকাময় পরিবেশের চাপা আতংক আমাদের পরিবারের ও মোস্তাফিজুর রহমান চাচুর পরিবারের এবং বাড়িওয়ালার অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে আমার আব্বা মরহুম সৈয়দ মোহাম্মদ ওসমান সাহেব, পি.ডাব্লিউডি তে কর্মকর্তা ছিলেন। দ্রুত রিটায়ারম্যান্টে গিয়ে ঢাকা হতে চট্টগ্রামে এসে পড়েন। আমার গর্ভধারিনী মাতা মরহুমা বেগম মোস্তফা ওসমান ঢাকায় ভিখারুননেসা নুন স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্বে রিজাইন দিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। আমার বাবা ঢাকা থাকতে না চাওয়ায় আমার মা চট্টগ্রামে এসেই চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় মরহুম বাদশাহ মিঞার স্বউদ্যোগে এবং তার কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় মুসলিম এডুকেশান সোসাইটি কিন্ডার গার্টেন সহ প্রাইমারী ও হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আমার মা মরহুমা বেগম মোস্তফা ওসমান ১৯৬০ সালে উল্লেখিত স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পান।
একাত্তরের ২৫মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী অবুঝ দেশবাসীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ বাহিনী ও সাধারণ সৈনিকদের উপর গুলি বর্ষণ করে। হাজার হাজার নির্দোষ নিরপরাধ আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকগণের উপর গুলি বর্ষণসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে এবং আমাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নামক পাকিস্তানের একাংশের উপর বিভিন্নভাবে জুলুম ও অত্যাচার চালায়। জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচারের হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দিলে দেশে বীর সন্তানেরা স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন গঠিত হয়। ‘বীর বাঙালি জেগে ওঠো, শক্ত হাতে অস্ত্রধর’ এই স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোমলমতি স্কুল/কলেজের ছাত্র/ছাত্রীরাও এবং বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধের প্রয়োজনে ট্রেনিং নিতে থাকে। প্রথম ছয় মাস স্কুল/কলেজ বন্ধ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের ৬ মাস অন্তে স্কুল/কলেজে ভয়ে ভয়ে ছাত্র/ছাত্রীরা যাওয়া–আসা করতে থাকে। মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি হাইস্কুলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেপ্টেম্বর/অক্টোবর মাসের দিকে আমার শ্রদ্ধেয় মা মিসেস ওসমান আমাদের বলেন, হানাদার বাহিনীর মিলিটারীদের গাড়ি স্কুলের মাঠে এসেছিল; ছাত্র/ছাত্রীরা ভয়ে জড়োসড় হয়ে পড়েছিল এবং অভিভাবকরা কান্নাকাটি করতে থাকে। প্রধান শিক্ষক পাঠরুমের দরজা বন্ধ করে দিতে বলেন। তখন এম.ই.এস. হাইস্কুলের কেবল মূল ভবন ছিল। অন্যান্য ভবন বা বাউন্ডারী ওয়াল বা সুন্দর গেইট কিছুই ছিল না। প্রধান শিক্ষক আমার মাকে বললেন, আপনি তো ছাত্রী অবস্থায় এক্সট্রা সাবজেক্ট হিসাবে উর্দু সাবজেক্ট নিয়েছিলেন এবং ভালোভাবে উর্দু বলতে পারেন। একটু মাঠে গিয়ে উনাদেরকে জিজ্ঞাস করেন উনারা (পাকবাহিনী) কিছু বলতে চাচ্ছেন কিনা। আপনি ছাড়া কেউ এই অবস্থা সামাল দিতে পারবে না। আমার মা তাড়াতাড়ি মাঠে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাস করলেন তারা এম.ই.এস স্কুলের মাঠে কেন এসেছেন? চোখ বড় বড় করে তারা জানতে চাইলেন বিল্ডিংটাতে কী হয়? স্টুডেন্ট আছে কিনা? আমরা বিচ্ছু খুঁজতেছি। আমার মা বলেন ‘জী নাহি, ইহামে কোয়ি স্টুডেন্ট নাহি হ্যায়, ইহামে বিচ্ছু নাহি হায়। এরপর তাঁকে প্রশ্ন করেন, আপ বিহারী হ্যায়, মা বললেন, ‘জী ম্যায়নেতো বিহারী হু’, এরপর তারা মাঠ হতে চলে যান। আমার মায়ের মুখে শোনা। এরপর নভেম্বরের দিকে এম.ই.এস স্কুলের নতুন বিল্ডিং এর পিছনের বড় নালায় কিছু বড় বড় ককটেল ফুটে, চনাচুরওয়ালা ও টোকাইয়ার বেশে ছোট ছোট বীর মুক্তিযোদ্ধা (ছাত্ররা, দেশপ্রেমিক সাধারণ নাগরিক মুক্তিযোদ্ধারা) রেখে যায়; স্পটে থাকা অথবা দায়িত্বে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা দায়িত্বের প্রয়োজনে যথাসময়ে বা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে অপারেশনের কাজে ব্যবহার করার প্রয়োজনে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু নভেম্বরের প্রথম দিকে এইভাবে ককটেল রাখা বা রেখে যাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে আবারও পাক হানাদার বাহিনীর গাড়ি এম.ই.এস. স্কুলের মাঠে এসে দাঁড়ায়। এবার কিন্তু মাঠ হতে হানাদার বাহিনী মিলিটারীরা গাড়ি নিয়ে বিদায় হয়নি । তারা গাড়ি হতে নেমে স্কুলের মূল বিল্ডিংয়ের পিছনের দরজায় যায় এবং হাঁকডাক করতে থাকে। সৌভাগ্যবশত সেইদিন স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যায়। স্কুলের টিচারগণ বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্ব সহ সর্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রেডিকরণের লক্ষ্যে মিটিং করছিলেন। স্কুলের তৎকালীন পিয়ন বারেক মিয়া হন্তদন্ত হয়ে তাদের বিল্ডিং এর পিছনের বারান্দার দরজায় অবস্থানের খবর দিলে, এসিস্টেন্ট হেডমাস্টারের অনুরোধে সেই সময়কার ধর্ম শিক্ষক তাদের মোকাবেলা করতে চাচ্ছিলেন না, বিধায় এসিস্টেন্ট হেডমাস্টারের অনুরোধে মা দ্রুত দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই তারা আবারও পূর্বের ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিনা? স্টুডেন্ট আছে কিনা? বিচ্ছু আছে কিনা? শিক্ষিকা জবাবে বলেন, ইহা বিহারীদের পরিত্যক্ত বিল্ডিং। এখানে কোন লেখাপড়া হয় না। এখানে স্টুডেন্ট নাই, এখানে বিচ্ছু নাই। তখন পাক হানাদার বাহিনীর সৈনিকরা জানতে চাইলেন, তোমরা এখানে কী করছ? তখন মা বললেন আমরা শুনেছি এখানে সরকারের রিলিফের খাদ্য আসবে, তাই বুভুক্ষু অবস্থায় আমাদের পরিবার–পরিজনকে খাদ্য খাইয়ে বাঁচাবার জন্য, রিলিফ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। এইভাবেই বিভিন্ন নগরে পাক হানাদার বাহিনীর হাত হতে দেশবাসী নিজেদেরকে সেইভ করে। একটি ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে দিন/ রাত্রি যাপনের মধ্যে দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অসংখ্য মানুষের, নাগরিকগণের, দেশবাসীর ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগে দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও প্রাণ বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এসেছিল।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের ভাড়াটিয়া ব্যাংকার ব্যাংকে গিয়ে আর ফেরত আসেনি। পাক হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে হত্যা করে। সমগ্র দেশে হাজার হাজার মানুষকে পাক হানাদার বাহিনী চরম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে চূড়ান্ত পরাজয়ের পূর্বে। পাক হানাদার বাহিনী দেশের বুদ্ধিজীবীদের যেমন নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে তেমনি বীরশ্রেষ্ঠ সৈনিক, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্য, কর্মকর্তা সহ লক্ষ লক্ষ দেশবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তদানীন্তন পাক হানাদার বাহিনীর হাত হতে সহজ, সরল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মাহুতির মধ্যদিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এই দেশ মুক্ত হয় পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত হওয়ার পর ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ইংরেজী পূর্ণ বিজয় লাভ করে এ দেশে অবালবৃদ্ধ বণিতা এবং এই দেশের নাম হয় বাংলাদেশ। লাল সবুজের পতাকার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান। বাঙালিদের এ দেশ বাংলাদেশ এবং পাহাড়ি, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান জনগণের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহ অবস্থানের দেশ বাংলাদেশ। বিশ কোটি বাংলাদেশীর প্রাণপ্রিয় মাতৃ ভূমি এই দেশ বাংলাদেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যমলা, নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ, ভাটিরদেশ বাংলাদেশ। এই দেশের প্রতিটি নাগরিক দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দেশমাত্রিকার সেবায় নিয়োজিত হয়ে দেশ রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর মত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ ও সাহসিকতার সাথে এই দেশ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। এটাই হোক আমাদের দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের স্বাধীনতার প্রকৃত মর্মবাণী।
লেখক: আইনজীবী।









