মৃত্যু বলতে জীবন থেকে হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার নাম। মৃত্যু হল জীবনের অবসান। আক্ষরিক জ্ঞানে হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়াকে আমরা সবাই মৃত্যু বলছি।
জীবনে বহু মৃত মানুষ দেখেছি। খুব সামনে থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার দৃশ্য দেখেছি মাত্র একটি। আমার বাবাকে দরজার আড়াল থেকে দেখেছিলাম, একনজর ভয়ে ভয়ে। কীভাবে মৃত্যু টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাবাকে এক অতলান্ত অন্ধকারে। কী ভয়াবহ অথচ নীরব সুন্দর সারেন্ডার প্রকৃতির অনন্ত উৎসবে। মৃত্যু আসলে এটাই। অসীম শূন্যের সাথে ধীরে ধীরে লীন হয়ে যাওয়া। তবে মৃত্যু কবি শিল্পীর প্রাণকে একঝটকানিতে টেনে নিলেও চেতনাকে কখনোই শূন্য করতে পারে না।
সেদিন অপরাহ্নে কড়কড়ে রোদে চট্টগ্রাম শহরের একটি স্বনামখ্যাত মৃত মুখ দেখতে ছুটে গিয়েছি, সাকিন উত্তর নালাপাড়া, কামাল গেইট, চট্টগ্রাম। শুয়ে আছে নির্বিকার নির্বিঘ্েন চিত্রকর কবি গল্পকার থিয়েটার শিল্পী সাফায়াত খান। গত একযুগ যার চলাফেরা ও বসবাস ছিল হুইলচেয়ারে। আমি অসুস্থ অবস্থায় যতবার তাকে প্রত্যক্ষ করেছি ততবারই গলাটা উঁচু দেখেছি। স্পন্ডালাইটিস রোগের কারণে কাবু বন্ধুটি গলা খানিক উঁচু করে কথা বলতেন।
অতএব হুইলচেয়ারের অন্যনাম হতে পারে বন্ধু সাফায়াত খান। কী অবর্ণনীয় কষ্টে ওষ্ঠাগত একটুকরো প্রাণকে চমৎকার হাস্যোজ্জ্বল টেনে নিয়ে গেছে মৃত্যুর দিকে! কষ্ট হতাশা আর্থিক টানাপোড়েন কাউকে বুঝতে না দিয়ে, বুকে চেপে বন্ধুবান্ধব সমাজ সংসারে মেতেছিলেন। সাফা, বন্ধু পরিবেষ্টিত থাকতে চাইতেন। পরিবারের চেয়ে বেশি সময় দিয়েছে সৃজনশীল কাজে। একটা হুইলচেয়ার তাকে গৃহবন্দী করে রাখতে পারেনি। বার–বার অস্ত্রোপচারে জর্জরিত ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে হুইলচেয়ারে ছুটে গেছেন শহরের বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে। আমরা যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা দেখেছি শুধু সাফা ও একটি হুইলচেয়ার। পেছনের দহন আমরা ক‘জন বুঝতে পেরেছি! অবর্ণণীয় যন্ত্রণা ও কষ্টের কথা সাফা–স্ত্রী বেলী ও হুইলচেয়ার সম্ভবত বুঝতে শিখেছিল। তাই বেলীভাবী কিংবা হুইলচেয়ার সাফাকে সাহিত্য অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত করেনি কখনো। সাফার দুঃখের জারিগান ছিল তার কোমলমতি স্ত্রী। হাড়ের বেদনা ছিল তার কন্যা।
২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যায় চিত্রকর কবি বন্ধু বিজন মজুমদারের আমন্ত্রণে আমরা অনেকেই বসন্ত উৎসবে উপস্থিত হয়েছি। মঞ্চে কবিতা পাঠ কথামালা ও আবৃত্তি চলছে। হঠাৎ দেখি, চারুকলা কলেজের পাহাড়কাটা খাঁজের এবড়োখেবড়ো পথে নিচের দিকে হুইলচেয়ারে নেমে আসছে বন্ধু সাফায়াত। পেছনে স্মিত হাস্যোজ্জ্বল বেলীভাবী। মাটি থেকে অন্তত পনেরো বিশ ফুট উচুতে বাঁশের মাচানে নির্মিত মঞ্চে টেনে তোলা হল হুইলচেয়ার সমতে বন্ধু সাফাকে। মঞ্চে বসানো হল তাকে। মুহূর্তেই সে হারিয়ে গেল অবচেতনে। ভাবলাম, শুনছেন পশ্চিম বঙ্গ থেকে আসা বিখ্যাত কবি বাচিকশিল্পী ডালিয়া বসু সাহ‘র কথা ও আবৃত্তি। ততক্ষণে সাফা ব্যস্ত হয়ে গেল বসু‘র ভিডিও নির্মাণে। হুইলচেয়ারের হাতলে শক্ত করে হাত রেখে আমি বন্ধুকে মঞ্চের চতুর্পাশে ঘুরিয়ে ভিডিও নির্মাণে সাহায্য করলাম। চারুকলার বসন্ত উৎসবের সে–ই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কবি আহমেদ খালেদ কায়সার, কবি চিত্রশিল্পী খালিদ আহসান। এ–ই দু‘জন স্বনামখ্যাত কবিও আমাদের ছেড়ে গেছেন অনন্তলোকে। কবি বিদগ্ধজন অরুণ দাশগুপ্তও আমাদের অভিভাবকশূন্য করে গেলেন মৃত্যুকে মহিমান্বিত করে। যুক্ত হলো এবার সাফায়াত খান। এক চিত্রার্পিত মৃত্যুর মিছিল অনন্তের দিকে ধাবমান। তারা সবাই চট্টগ্রামসহ সারাদেশের তুমুল অহংকার। সৃজনশীলতার জন্য পাহাড় ডিঙ্গিয়ে শারীরিক অসুখবিসুখ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে হেঁটে গেছে অনন্তের পথে। এঁদের মধ্যে সাফায়াত খান ছিল দুর্দান্ত স্পষ্টবাদী। সত্য যতই এখনকার সময়ে দৈত্য হোক, মুখের উপর ছুঁড়ে দিতে পিছপা হননি কখনো। সাফা ছিলেন স্বভাবে ঋজু। সাহিত্য আড্ডায় হাসি তামশা উইট হিউমারের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে পারতেন খুব সাবলীলভাবে। গল্প কবিতা প্রবন্ধের তির্যক আলোচনায় মেতে থাকতেন সর্বত্র। তবে অন্তঃস্রোত ছিল স্ফটিক জলের মতো স্বচ্ছ ও সুন্দর। নিজে প্রাচী নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। প্রাচী পত্রিকায় কত লিখেছি! বিজ্ঞাপনহীন পত্রিকা বছরে দুই তিনটা সংখ্যা হড় হড় করে বেরিয়ে যেত। পত্রিকা নিয়ে অফিসে এসে সৌজন্য সংখ্যা দিয়ে যেত। পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখিই তার আরাধ্য ছিল। আমার কেন জানি মনে হতো চিত্রশিল্পের চেয়ে অক্ষর শিল্পেই তার মুক্তি ছিল বেশি। একটা কবিতা ও গল্প লিখতে পারলেই রাজ্যের শান্তি। কেউ পাঠ – উত্তর কিছু বলতে চাইলে মনোযোগ দিয়ে তা শুনতো। খুব নিকটের কেউ হলে তাদের পড়েও শোনাতেন।
সাফায়ত মানে একটা দুর্দান্ত সময়। যৌবনে কাঁচা হলুদ বর্ণের অসম সাহসী দারুণ স্মার্ট এক যুবক। মুখাকৃতি ও দৈহিক গঠন ও সৌন্দর্যে বৌদ্ধ জাপানিজদের মতো অনেকটা। জাপান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। চাইলেই জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে বৈষয়িক হওয়া খুব কঠিন ছিল না। শিল্পের টানে, মায়ার টানে ফিরে এলেন স্বদেশে। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সাফা ছিল অগ্রগামী। স্বৈরাচার শাসক এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান, শিল্পের ভাষায় প্রতিবাদ, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাটক,রঙ তুলি নিয়ে প্রতিবাদের ভাষা তৈরি ছিল তার নেশা। ব্যাংকের হিসাব খোলা থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাক্ষী ছিলাম আমি। শারীরিক এতো বৈকল্য সত্ত্বেও একদিনের জন্য লেখা ছাড়েনি। কোভিড উনিশ শুরু হলে হুইল চেয়ারে শুয়ে–বসে লেখালেখিতে মেতেছিলেন। বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা ও দৈনিক আজাদীসহ ঢাকার কিছু পত্রিকায় লেখা ছাপা হতো।
কাটাপাহাড়ের চতুষ্কোণে সাফাস স্টুডিও ছিল তার প্রাণশক্তি। দেদারসে প্রতিদিনের সাহিত্য আড্ডা সাফাস স্টুডিও রঙিন হয়ে উঠতো। কবি সাহিত্যিকদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সাহায্য সহযোগিতাসহ হেন কাজ নেই সাফা করেনি–এমন।
এবছরের ২৩ মার্চ তার একটি কবিতা ফেসবুক স্ক্রিনে দেখি; শিরোনাম তোমার জন্য। তোমার জন্য কিনেছি /একটি সোমত্ত শহর /পাহাড় আর সমুদ্রে মিলে /দেবালয়ে। / চল, চলে যাই /নোঙর তুলেছে / ময়ূরপঙ্খি নাও /আর নয় মায়াহীন এ – লোকালয়ে / যাবে? / সন্ধ্যা নেমেছে /শুকতারা দাঁড়িয়ে / ফুলেল আহবানে / চল এ মায়াময় ছেঁড়ে আমার সোমত্ত শহরে “।
সাফায়াত খান যে ধীরে ধীরে নোঙর মাটি থেকে তুলে ফেলেছে। ময়ূরপঙ্ক্ষি প্রস্তুত করে রেখেছে কে জানতো! একজন কবি লেখক বোধ করি এ–ভাবে মৃত্যুকে আগাম টের পেয়ে যান।
মৃত্যু সম্পর্কে কিছু মনীষী পৃথিবীখ্যাত লেখক এভাবে বলেন; ১) জীবন মনোরম মৃত্যু শান্তিদায়ক। সংকটময় তো শুধু জীবন সন্ধিক্ষণের সময়টুকু, ২) মৃত্যু একটি জীবনকে ধ্বংস করতে পারে তবে একটি সম্পর্কেকে কখনোই নয়। সেটা জানে তার সহযোদ্ধারা। জানে সাফা–স্ত্রী বেলী এবং তাদের একমাত্র কন্যা জেরিন তাসনিম খান। প্রিয় সাফাভাই অনুভূতির কালো ঘোড়া সবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আস্তাবল থেকে একদিন অন্যটাও দৌড় দিতে পারে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক












