ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান; জনগণের কাছে ধানের শীষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নিজের প্রথম নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ বিজয়ী হলে, আগামী দিনে সরকার গঠন করলে, নবীর (সা.) ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে বিএনপি।
বাহরাইনে জামায়াত নেতার বাসায় পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার প্রসঙ্গ ধরে তারেক বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আপনারা দেখেছেন, পত্রপত্রিকায় এসেছে, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ব্যালট যেগুলো পাঠানো হয়েছে সেগুলোকে কীভাবে ডাকাতি করা হয়েছে। যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গেছে তারা যেভাবে আপনাদের ভোট ডাকাতি করেছিল, ঠিক একইভাবে আবার সেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। দেখেছেন আপনারা? সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে। বিদেশে বসে তারা ষড়যন্ত্র করছে। খবর বিডিনিউজের।
তারেক রহমান বলেন, ইলিয়াস আলী, দিদার জুনায়েদসহ হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি, চব্বিশের গণআন্দোলনে এই সিলেট শহরে ১৩ জন আমাদের জীবন দান করেছে। এই প্রাণগুলোর বিসর্জনের মাধ্যমে আমরা যে অধিকার আদায়ের পথে নেমেছি, একটি কুচক্রি মহল এরই ভিতরে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। দেশের ভেতরেও তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। ২৪ সালের ৫ আগস্ট এই বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করে দিয়েছে যে বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যে কোনো ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করতে পারে। পারবেন আপনারা প্রতিহত করতে? ইনশাআল্লাহ।
নির্বাচনী প্রচারে নেমে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডেরও কঠোর সমালোচনা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। জনসভায় শ্রোতা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, আপনি কাবা শরিফে গেছেন, কাবা শরিফের মালিক কে?
ওই ব্যক্তি উত্ত দেন, ‘আল্লাহ’।
বিএনপি চেয়ারম্যান জানতে চান, আমরা মুসলমান সবাই, এই দিন–দুনিয়ার আমরা যে এই পৃথিবী দেখি, এই পৃথিবীর মালিক কে?। উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’। তারেক রহমান আবার প্রশ্ন করেন, এই সূর্য নক্ষত্র যা দেখি তার মালিক কে? উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’। বিএনপি চেয়ারম্যান প্রশ্ন করেন, বেহেস্তের মালিক কে? জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আল্লাহ’। তারেক এবার জানতে চান, দোজখের মালিক কে? উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’।
এসময় উপস্থিত জনতাও সমস্বরে ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ উত্তর দেন। এরপর তারেক রহমান বলেন, আপনারা সকলেই সাক্ষী দিলেন, দোজখের মালিক আল্লাহ; বেহেস্তের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে নির্বাচনের আগেই একটি দল ‘এই দেব, ওই দেব বলছে’; টিকেট দেব বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে, শেরকি করা হচ্ছে, হচ্ছে না? যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু আল্লাহর, একমাত্র সবকিছুর অধিকার– উপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকাবে আপনাদেরকে– বোঝেন এবার। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, শুধু ঠকাচ্ছেই না মানুষকে, যারা মুসলমান তাদেরকে শেরকি করাচ্ছে তারা; নাউজুবিল্লাহ। প্রিয় ভাই–বোনেরা, কেউ কেউ বলে অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি– এবার একে দেখেন।
জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রিয় ভাই–বোনেরা, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, যে যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাদের ভূমিকার কারণে এই দেশের লক্ষ লক্ষ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছে। এই দেশের লক্ষ লক্ষ মা বোনেরা– তাদের সম্মানহানি হয়েছে; কাজেই তাদেরকে তো বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যেই দেখেই নিয়েছে। এই কুফরির বিরুদ্ধে, এই হঠকারিতার বিরুদ্ধে, এই মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদেরকে ওই যে ‘টেইক ব্যাক বাংলাদেশে’ থাকতে হবে।
বেলা ১২টা ২৮ মিনেটে আলিয়া মাদ্রাসার মঞ্চে উঠেন তারেক রহমান। বক্তব্য দেন ২৩ মিনিট। তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে নেতা–কর্মীদের ওপর নিপীড়ন–নির্যাতন, মামলা–মোকাদ্দমা, গুম, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, লুটপাট, রাষ্ট্র কাঠামো রূপান্তরের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মাস কার্ড, হেলফ কার্ড, খাল খনন, বেকারদের কর্মসংস্থানসহ আগামীর পরিকল্পনাগুলো উঠে আসে।
প্ল্যান তুলে ধরলেন তারেক রহমান : দেড় দশকের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার দিন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, তার বিস্তারিত তুলে ধরলেন মৌলভীবাজারের জনসভায়। তিনি বলেছেন, আমি একটানা ১৭ বছর পর যখন বিদেশ থেকে ফিরে এসেছি, একটি কথা বলেছিলাম– মনে আছে আপনাদের, আই হ্যাভ এ প্ল্যান বলেছিলাম না? সেই প্ল্যানের অর্থ একটি অংশ হচ্ছে আমরা এদেশের বেকার যারা যুবক আছে; শিক্ষিত হোক, অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত– সকল মানুষের জন্য আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। যাতে এই মানুষগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, শক্ত ভিত্তির ওপর যাতে এই মানুষগুলো দাঁড়াতে পারে।
বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মৌলভীবাজারের আইনপুর খেলার মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, যুব সমাজের যারা সদস্য, তরুণ সমাজের যারা সদস্য– তাদের শুধু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নয়; আমরা তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবেও সক্ষম গড়ে তুলতে চাই। যেন আপনারা লন্ডনে যান, অথবা এখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যান, অথবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে যান; আমরা আপনাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে পাঠাব; আপনাদেরকে সেই দেশের ভাষা শিক্ষা দিয়ে পাঠাব, যাতে ওই দেশে গিয়ে আপনারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা দ্রুত করতে পারেন। যাতে করে আপনাদের আয়–রোজগার যদি আপনারা কোনো রকম দক্ষ না হয়ে সে দেশে যান, আয় রোজগার কম হবে; কিন্তু যদি কোনো ট্রেনিং নিয়ে যান তাহলে কী হবে? রোজগার বেশি হবে না? আমরা সেই ব্যবস্থা এদেশের মানুষের জন্য করতে চাই।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই এলাকায় তো ১৩০টির মতন চা বাগান রয়েছে, আছে না? এই চা বাগানের শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা, তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়। তাদের যে আয় রোজগার হয়, সেটি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সেই সকল পরিবারকে, সেই সকল নারীদেরকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তাদেরকে আমরা হয় খাদ্য সহায়তা দেব অথবা তাদেরকে আমরা নগদ সহায়তা দেব যাতে করে তারা তাদের সংসার সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে পারে সুন্দরভাবে চালিয়া নিতে পারে।












