আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজও নানা প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, বিরোধী মতের অধিকার এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা এসব মৌলিক বিষয় ঘিরে জনমনে যে সংশয় ও প্রত্যাশা যুগপৎ বিরাজ করছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে তা কেবল সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে। ভোট কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি নাগরিক সম্মতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতীক। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যখন নির্ভয়ে তাদের মত প্রকাশ করতে পারে, তখনই রাষ্ট্রের বৈধতা সুদৃঢ় হয়। বিপরীতে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে শুধু নির্বাচিত সরকার নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাই আস্থার সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কিছু নির্বাচন আশার আলো জ্বালিয়েছে, আবার কিছু নির্বাচন হতাশা সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতার আলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতির প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। এই সার্বভৌমত্ব বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন যত বেশি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, ততই জনগণের ক্ষমতা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি নির্বাচন একতরফা হয় বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিগুলো অংশগ্রহণের বাইরে থাকে, তবে সাংবিধানিক বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি। এই আস্থা শুধু ভোটারদের মধ্যেই নয়; রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থার মধ্যেও থাকতে হবে। এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছাড়া অবাধ নির্বাচন কল্পনাও করা যায় না। কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক কমে এবং ফলাফল সহজে গ্রহণযোগ্য হয়।
নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশাসনের ভূমিকা। মাঠপ্রশাসন যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না থাকে, তাহলে ভোটের দিন সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে দেখা গেছে, প্রশাসনিক পক্ষপাত, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। জেলাপ্রশাসন থেকে শুরু করে থানাপর্যায় পর্যন্ত সকল কর্মকর্তাকে আইনের শাসন ও পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মানদণ্ডে কাজ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও একটি অবাধ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক উত্তাপ, জনসমাগম ও প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, ভোটাররা যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখানে হতে হবে দৃঢ় কিন্তু নিরপেক্ষ। কোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট থাকতে হবে।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমান সুযোগ। সকল রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রচারে সমান সুযোগ না দিলে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, প্রশাসনিক সুবিধার একতরফা ব্যবহার, গণমাধ্যমে অসম প্রচার এসবই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব অনিয়ম প্রতিরোধ করা না গেলে নির্বাচন যতই শান্তিপূর্ণ হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হবে।
গণমাধ্যম একটি নির্বাচনের আয়না। অবাধ ও স্বাধীন গণমাধ্যম নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করে তোলে, অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে এবং ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। কিন্তু যদি গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, যদি সংবাদ পরিবেশনে ভয় বা পক্ষপাত কাজ করে, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করা তাই গণতন্ত্রের স্বার্থেই জরুরি।
সিভিল সোসাইটি ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও এখানে উপেক্ষণীয় নয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে যে প্রতিবেদন দেন, তা শুধু সরকারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।
ভোটারদের অংশগ্রহণ একটি নির্বাচনের প্রাণ। ভোটার উপস্থিতি যত বেশি হয়, নির্বাচন তত বেশি প্রাণবন্ত ও গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, যদি তারা বিশ্বাস করেন ফলাফল আগেই নির্ধারিত, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ হারান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া এবং বাস্তব দৃশ্যমান পরিবর্তন।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এখানে অপরিসীম। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে। সহনশীলতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সহিংসতা পরিহার এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা এসবই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো যদি দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করে, তাহলে নির্বাচন অনেকটাই সহজ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি, শান্তিরক্ষা মিশন, জলবায়ু কূটনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তরুণ প্রজন্ম এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ, যারা ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তরুণদের কাছে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস গড়ে তুলতে হলে তাদের ভোটাধিকারকে অর্থবহ করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি তরুণদের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হবে।
নারীর অংশগ্রহণও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদণ্ড। নারী ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোট দিতে পারেন, নারী প্রার্থীরা যেন সমান সুযোগ পান এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক নির্বাচন।
সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো একক পক্ষের পরীক্ষা নয়; এটি রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি জনগণের সম্মিলিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে বাংলাদেশ শুধু একটি সরকার পাবে না, পাবে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে রাজনৈতিক বিভাজন কমাতে, আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশকে স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে।
অতএব, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সকল পক্ষের উচিত সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। গণতন্ত্র কোনো একদিনের আয়োজন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর। জাতি হিসেবে আমরা যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, উন্নত ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবশ্যই হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য্তএর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম একাডেমি।












