লোহাগাড়ায় ঈদের ছুটিতে ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে একই স্থানে ৩ সড়ক দুর্ঘটনায় নারী–শিশুসহ ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০ জন। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, গত ৩১ মার্চ ঈদের দিন সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজারমুখী যাত্রীবাহী বাসের সাথে বিপরীতমুখী যাত্রীবাহী মিনিবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মিনিবাসের ৫ যাত্রী ঘটনাস্থলে নিহত হন। তারা হলেন লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের আঁধারমানিক সেনেরচর এলাকার আবদুল মতলব প্রকাশ সোনা মিয়ার পুত্র আরফাত হোসেন (২১), একই ইউনিয়নের নুরজাহান বিবির পাড়ার মো. বদিউল আলমের পুত্র এসএসসি পরীক্ষার্থী রিফাত হোসেন (১৯), একই ইউনিয়নের ছগিরা পাড়ার মৃত নুরুল ইসলামের পুত্র নাজিম উদ্দিন (২৮), একই উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি খলিফার পাড়ার প্রবাসী আমির হোসেনের পুত্র জিসান হোসেন (২২) ও সাতকানিয়া উপজেলার ডেলিপাড়া এলাকার মো. সাত্তারের পুত্র মো. সিদ্দিক (২০)। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯ জন। মিনিবাসটি উখিয়ার কোটবাজার এলাকা থেকে যাত্রী নিয়ে লোহাগাড়া–সাতকানিয়ায় আসছিল।
ঈদের পরদিন ১ এপ্রিল ভোরে একই স্থানে পর্যটকবাহী দুটি মাইক্রোবাস ১০ মিনিটের ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ৩০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যায়। এতে ৯ যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা চকবাজার এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের মেয়ে মিনার শারমিন (৪২), ফারিহা সিদ্দিক (২২), সাইফুল ইসলামের মেয়ে মেহেক ইসলাম (১৬), স্ত্রী নুরজাহান (৪৭), ইয়াসিন আরাফাতের স্ত্রী ফাতেমা (৩২), ছেলে আরাফাত (৬), কুমিল্লার লালমাই থানার কাছিয়া পুকুরিয়া গ্রামের মৃত ইয়াকুবের পুত্র নোমান (২০)।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার সাভার ও ও কুমিল্লা থেকে পৃথক দুটি মাইক্রোবাসে প্রায় ২২ জন পর্যটক নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল। ঘটনাস্থলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাস দুটি খাদে পড়ে যায়।
অপরদিকে ঈদের তৃতীয় দিন ২ এপ্রিল সকাল ৭টার দিকে একই স্থানে কক্সবাজারমুখী মাইক্রোবাসের সাথে বিপরীতমুখী যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে মাইক্রোবাসের চালকসহ ৭ যাত্রী নিহত হন। গুরুতর আহত ৬ যাত্রীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন একজন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে চার জন নারী, দুজন শিশু ও পাঁচজন পুরুষ।
নিহতরা হলেন ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকার দুলাল বিশ্বাসের পুত্র দিলীপ বিশ্বাস (৪৩), দিলীপ বিশ্বাসের স্ত্রী সাধনা মন্ডল (৩৭), দিলীপের শ্বশুর আশীষ মন্ডল (৫০), ঢাকার মিরপুরের আব্দুল জব্বারের পুত্র রফিকুল ইসলাম শামীম (৪৬), রফিকুল ইসলামের স্ত্রী লুৎফুন নাহার সুমি (৩৫), মেয়ে তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা (১৮), মেয়ে আনিসা (১৪), মেয়ে লিয়ানা (৮), মৃত রফিকুল ইসলামের ভাগিনা তানিফা ইয়াসমিন (১৬), মামা মুক্তার হোসেন (৬০) ও মাইক্রোবাস চালক ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার কালা মিয়ার পুত্র মো. ইউসুফ আলী (৫৫)। এ ঘটনায় গুরুতর আহতরা হলেন দুর্জয় মন্ডল (১৮) ও আরাধ্যা বিশ্বাস (৭) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার শিশু আরাধ্যা বিশ্বাসকে (৭) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চট্টগ্রামমুখী রিলাক্স পরিবহনের দ্রুতগতির যাত্রীবাহী একটি বাস চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকার মহাসড়কের একটি বাঁকে আসে। তখন চালক হার্ড ব্রেক করতে গেলে বাসটির সামনের অংশ ঘুরে যায়। এতে বাসটি মহাসড়কে আড়াআড়ি হয়ে যায়। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা কক্সবাজারমুখী দ্রুতগতির একটি মাইক্রোবাসের সাথে বাসটির সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের টিম লিডার রাখাল চন্দ্র রুদ্র জানান, ঈদের দিন দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে ৫ জনের ও ঈদের তৃতীয় দিন বাসের সাথে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থল থেকে ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া আহত অবস্থায় ৬ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে ৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার সংবাদ শুনেছেন।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শুভ রঞ্জন চাকমা জানান, একই স্থানে পৃথক তিন দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িগুলো উদ্ধার করে হাইওয়ে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী রুজু করা হয়েছে। কিন্তু বাস চালকের হদিস মেলেনি এখনো।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, টানা দায়িত্ব পালনকালে ক্লান্ত চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। যার কারণে লবণ পানিতে পিচ্ছিল ও বাঁকযুক্ত সড়কে বাসটির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি চালক। রাস্তায় ঘন ঘন বাঁক, ঢালু রাস্তা এবং লবণ পানি পড়ে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া ওই এলাকায় সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর কারণ বলে মনে করেন তিনি।