ঋণের সুদ আবারও এক অঙ্কে আনার দাবি ব্যবসায়ীদের

| মঙ্গলবার , ৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংক ঋণের সুদের হার আবারও এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এবার একবারে নয়, ধীরে ধীরে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার আহ্বান জানান তারা। ব্যবসাবাণিজ্যে বিভিন্ন ধরনের সংকটের কথা বলে অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এ ধরনের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) নেতারা। এসব উদ্যোগের মধ্যে রপ্তানি উন্নয়নের স্বার্থে ইডিএফ ফান্ডের পরিসর বিস্তৃতিকরণ ও সকল রপ্তানি খাতের জন্য উন্মুক্ত রাখার অনুরোধও জানান ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। খবর বাংলানিউজের।

গতকাল সোমবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এফবিসিসিআইয়ের নেতারা বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগীতা সক্ষমতা ধরে রাখা ও বিনিয়োগের স্বার্থে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। সুদের হার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পন্থা হলেও আর্থিক খাত, রাজস্ব খাত ও বাজার ব্যবস্থাপনার পরিপূর্ণ সমন্বয় ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য সুদ হার কমিয়ে আনতে হবে।

একই দিন আলাদা করে ঢাকা চেম্বারের নেতারাও গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনার দাবি জানান। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশের ব্যাংক খাতের ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হয়েছিল। তখন আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নিয়ে আসা হয় এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ করা হয়। যা ব্যাংক খাতে নয়ছয় হিসেবে পরিচিত। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সুদের হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করে দেওয়া হয়।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ব্যবসায়ীরা বৈদেশিক মুদ্রার যোগান স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থে প্রয়োজনীয় পলিসি সহায়তা প্রদান, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ যথাসাধ্য বৃদ্ধি করা, অনাদায়ী ও খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনা, জনশক্তি রপ্তানী বাড়াতে বিদেশগামীদের আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণসহ অবাধ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেন। একক গ্রাহক ঋণসীমা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব করেন তারা।

এফবিসিসিআইর প্রশাসক বলেন, কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্প ও সেবা খাতকে প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান ইতিবাচক উদ্যোগ ছিল।

যা ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য সহায়ক হয়েছিল। এফবিসিসিআই মনে করে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনাসহ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, ধারাবাহিক ও বাস্তবভিত্তিক মূদ্রানীতি প্রণয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষনে বর্তমান গভর্নরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের ব্যাংকিং সমস্যা দ্রুত সমাধানে বিশেষ কমিটি গঠনের আহ্বান জানান এফবিসিসিআইর মহাসচিব মো. আলমগীর। তিনি দেশের ব্যবসা বাণিজ্য তথা অর্থনীতির স্বার্থে এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

একইদিন গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ডিসিসিআই নেতারা ব্যাংক ঋণের বর্তমান উচ্চ সুদ হার ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য কোনভাবেই সহায়ক নয় বলে জানান। তারা গভর্নর মোস্তাকুর রহমানকে বলেন, বর্তমানে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশ। আর গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার ১৬১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থা ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য কোনভাবেই সহায়ক নয়। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যাংক ঋণের বাড়তি সুদ হার স্বল্প মুনাফাভিত্তিক উৎপাদনশীল শিল্পের জন্য মোটেও সহায়ক নয়। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমেছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ অবস্থা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকটের প্রতিফলন। এ কারণে ব্যাংক থেকে অর্থায়ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্রমেই ব্যয়বহুল ও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্বল্প মুনাফাভিত্তিক উৎপাদনশীল শিল্পের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিষয়টি মোকাবেলায় নীতি সুদের হার ক্রমান্বয়ে কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাত, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং এসএমই খাতের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকিযুক্ত ঋণসুবিধা চালু করার প্রস্তাব করেন ডিসিসিআই সভাপতি। যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। তিনি আরোও বলেন, ঋণ গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের সুদের হারের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে ৫ শতাংশেরও বেশি স্প্রেড রেট বিদ্যমান রয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতে বিশেষকরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে এবং সেই সাথে বেসরকারি বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, সামপ্রতিক সময়ে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনা, ব্যবসা পরিচালনায় উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং কম চাহিদার মতো সমস্যায় থাকায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। বিষয়টি বিবেনায় নিয়ে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পুনর্বিবেচনা করার পাশাপাশি ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা কমপক্ষে ৬ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তাসকীন আহমেদ।

ডিসিসিআই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পণ্য, সেবা ও রপ্তানি বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং এ অবস্থা উত্তরণে আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমপ্রসারণের কোন বিকল্প নেই, বিশেষ করে দেশের সিএসএমই খাত ও কৃষি ব্যবস্থাপনা ওপর অধিক হারে গুরুত্বারোপ করতে হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। দেশে দীর্ঘসময়ের বজায়ে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য লজিস্টিক ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের উচ্চ হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সামপ্রতিক বছরগুলোতে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আশাব্যঞ্জক না হওয়ায় আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষনসহ স্থানীয় বিনিয়োগ সমপ্রসারণেও পিছিয়ে রয়েছি, এ অবস্থা উত্তরণে ব্যবসাবাণিজ্য বিষয়ক নীতিমালার সংষ্কারের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসের কোন বিকল্প নেই। এ সময় ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এফবিসিসিআইর প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজর সভাপতি আনোয়ারউলআলম চৌধুরী পারভেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম সরকার, বিজিএমইএর পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান, এফবিসিসিআিইর সাবেক পরিচালক গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী (খোকন), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এঙপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম, বারভিডার সভাপতি মো. আবদুল হক, উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওয়েব) সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানু. অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুঃ অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন, বাংলাদেশ সিএনজি মেশিনারিজ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকির হোসেন নয়ন ও বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক জাকির হোসেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাতীয় সংসদে একাধিক বিল পাস
পরবর্তী নিবন্ধইরান যুদ্ধে ইউরোপের ভূমিকায় প্রশ্নের মুখে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ