চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রায় ৩৫ বছর পর ঘোষিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের তফসিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। তাই এবারের ঘোষণা যেন নতুন করে প্রাণ জুগিয়েছে পুরো ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীরা একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে প্রতিক্রিয়া জানানো, আর ক্যাম্পাসে চলছে উত্তেজনা–প্রত্যাশার মিলনমেলা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন, লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া কিংবা আড্ডাস্থল সব জায়গায় এখন আলোচনার মূল বিষয় চাকসু। একদিকে শিক্ষার্থীরা নতুন অভিজ্ঞতার জন্য মুখিয়ে আছেন, অন্যদিকে ছাত্রসংগঠনগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে। ফলে চবির প্রতিটি কোণ যেন ফিরে পেয়েছে রাজনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য।
শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস: তফসিল ঘোষণার পর নবীন শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেই এতদিন শুধু চাকসুর নাম শুনেছেন, কিন্তু দেখেননি এর বাস্তব চিত্র। এবার তারা সরাসরি অংশ নিতে পারবেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। সিনিয়র শিক্ষার্থীরা নবীনদের শোনাচ্ছেন অতীতের গল্প–কীভাবে চাকসু এক সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত, কীভাবে নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, আমরা এতদিন চাকসুর কথা বইয়ে পড়েছি বা শিক্ষকদের কাছ থেকে শুনেছি। এবার নিজের চোখে তা দেখতে পারছি। নিশ্চয়ই এটা আমাদের জন্য বড় অভিজ্ঞতা হবে। দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী শিমুল মিয়া বলেন, চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছি। আশা করি এটি আমাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাকির হোসেন খন্দকার বলেন, বৈধ নেতৃত্বের স্বাদ থেকে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত ছিলো, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। নতুন যে সূর্যোদয়ের হাতছানি দিচ্ছে তা যেন কেউ কালো আঁধার দিয়ে ঢেকে দিতে না পারে সেজন্য সচেতন করতে হবে এবং নিজে সচেতন থাকতে হবে।
ছাত্রসংগঠনের ব্যস্ততা : তফসিল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেয়াল লিখন, মিছিল আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। প্রতিটি সংগঠন চাইছে তাদের প্রার্থী যেন নির্বাচনে জয়ী হয়। তাই তারা ব্যস্ত কর্মপরিকল্পনা, প্রচার কৌশল ও জোট গঠন নিয়ে। সোহরাওয়ার্দী হলের এক ছাত্রনেতা বলেন, এটি আমাদের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। দীর্ঘদিন পর চাকসু নির্বাচন হচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করুক, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে।
সংগঠনগুলোর ভেতরেও চলছে প্রাণচাঞ্চল্য। কেউ কেউ ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, আবার কেউ করছে গোপন বৈঠক। আবাসিক হলগুলোর করিডোরে রাতভর আলাপ চলছে সম্ভাব্য জোট ও নির্বাচনী ইস্যু নিয়ে।
প্রত্যাশা ও শঙ্কা : শিক্ষার্থীরা চাকসু নির্বাচনের প্রতি যেমন আশাবাদী, তেমনি কিছুটা শঙ্কিতও। তারা চান নির্বাচন যেন সহিংসতা ও অনিয়মমুক্ত হয়। কারণ অতীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সহিংসতার নজির আছে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মামুন বলেন, আমরা চাই নির্বাচন হোক অংশগ্রহণমূলক। চাকসু হবে আমাদের সমস্যা সমাধানের জায়গা। পরিবহন সংকট, আবাসন সমস্যা কিংবা পরীক্ষার অনিয়ম এসব বিষয়ে আমরা চাই প্রতিনিধিরা কার্যকর ভূমিকা রাখুক। অন্যদিকে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী মেহজাবিন খান মনে করেন, চাকসুতে আসা নেতারা যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেন, তবে আমাদের জীবন অনেক সহজ হবে। তবে যদি ক্ষমতা আর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলে, তাহলে চাকসুর কোনো অর্থ থাকবে না।
অতীত চাকসুর ভূমিকা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসুর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকে চাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষা আন্দোলন, ফি নির্ধারণ, পরিবহন সংকট সমাধান, আবাসিক হলের সমস্যা কিংবা নানান একাডেমিক ইস্যুতে চাকসুর নেতারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি চাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস নিয়ে অংশ নিয়েছেন। তখনকার ভিপি ও জিএসরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ করতেন, শিক্ষার্থীদের হয়ে প্রশাসনের কাছে দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক ধরনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তারা আশা করছেন, নতুন চাকসুও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে একই ভূমিকা পালন করবে।
তফসিল ঘোষণার পর চবির ক্যাম্পাসে এখন সত্যিকারের উৎসবের আমেজ। দেয়ালে দেয়ালে রঙিন পোস্টার, আবাসিক হলে ব্যানার, ক্যাম্পাসে মিছিল ও সভা সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন যেন বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন প্রাণ দান করেছে।
ক্যাম্পাসের ভেতর অনেক জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মত গান গেয়ে কবিতা আবৃত্তি করে শিক্ষার্থীরা চাকসু নির্বাচনের আনন্দ প্রকাশ করছেন। কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকরা বলছেন, তারা বহুদিন পর ক্যাম্পাসে এমন প্রাণচাঞ্চল্য দেখছেন। শিক্ষা ও রাজনীতির সমন্বয়ে এই পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সচল করে তুলবে।
শিক্ষক সমাজও চাকসু নির্বাচনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। অনেক শিক্ষক মনে করেন, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব গড়ে ওঠার জন্য চাকসু অপরিহার্য। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কলা অনুষদের অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হুসাইন বলেন, চাকসু হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রের প্রতীক। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে নেতৃত্ব শেখে, সমাজের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে। দীর্ঘ বিরতির পর এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আশীর্বাদ।
চাকসুর সাবেক নেতারা এ নির্বাচনকে দেখছেন আশা ও দায়িত্বের দৃষ্টিতে। সাবেক ভিপিরা স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, চাকসু তাদের জীবন ও নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাবেক ভিপি এসএম ফজলুল হক বলেন, চাকসু আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। আমি বিশ্বাস করি, নতুন চাকসু থেকেও এমন নেতৃত্ব উঠে আসবে, যারা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অবদান রাখবে।
চাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত আবাসিক হল নির্মাণ, পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, গ্রন্থাগার আধুনিকীকরণ, পরীক্ষার সময়সূচি ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবেন।
দীর্ঘ তিন যুগের অপেক্ষার পর অবশেষে এই নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণ সরগরম কেবল একটি বিষয় নিয়েই–কেমন হবে আগামী দিনের চাকসু?