ধর্ম যার যার, উৎসব সবার–এই অসামপ্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ বাঙালি আমরা। মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র রমজান মাসে এক মাস রোজা রেখে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির পথে নিজেদের নিয়োজিত করেন। সংযমী জীবনযাপন করেন এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের মাধ্যমে নিজেদের চিত্তকে পবিত্র করার চেষ্টা করেন। এই এক মাসের সাধনার পরই আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব–পবিত্র ঈদুল ফিতর। ছোটবেলায় ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় টিভি সেট থেকে ভেসে আসত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা সেই কালজয়ী গানের সুর– ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। আহা, কী আনন্দ! ঈদের আনন্দে দল–মত–ধর্ম, ধনী–গরিব, ছোট –বড় নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে আনন্দ অনুভব করে। ঈদ যেন সত্যিই সকলের প্রাণের উৎসব। ঈদের প্রভাতে রক্তিম সূর্যোদয়ের পর একই প্রাঙ্গণে, একই কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা এবং নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করার অপূর্ব দৃশ্য আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঈদের মাহাত্ম্য এখানেই–এই উৎসব সকল ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে মানুষের হৃদয়কে আনন্দ, অনুরাগ ও ভালোবাসার স্পর্শে স্নাত করে। মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। ঈদের নতুন জামা, নানা বাহারের সেমাই, পোলাও–মাংস ও সুস্বাদু খাবার, আর সালামের সৌজন্যে বড়দের কাছ থেকে পাওয়া ঈদি–এসবই আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ। এসব আনন্দ ছোট–বড় সকলকে আন্তরিকভাবে কাছে টানে। এখানে থাকে না কোনো কৃত্রিমতা; থাকে কেবল মানুষের প্রতি মানুষের নিরহংকার সৌম্যতা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। ঈদের মতো অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবও আমাদের সমাজে একইভাবে মানবিক ও সামাজিক তাৎপর্য বহন করে। যেমন হিন্দু সমপ্রদায়ের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের বড়দিন –এসব উৎসব শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক উৎসব হিসেবেও মানবতার বার্তা বহন করে। মানবতা এমন এক মহৎ গুণ, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং অন্যের কল্যাণের কথা ভাবতে শেখায়। যে হৃদয়ে মানবপ্রেম তথা প্রাণীপ্রেম জন্ম নেয়, সে কখনো অনভিপ্রেত বা অকল্যাণকর কাজ করতে পারে না। কারণ তখন অকুশল চিন্তা করলেই বিবেক তাকে দংশন করে। মানবতা, সাম্য, অসামপ্রদায়িকতা ও ঐক্যের ভিত আমাদের সমাজে আজ বড়ই প্রয়োজন। কবি শেখ ফজলল করিম তাঁর ‘স্বর্গ ও নরক’ কবিতায় লিখেছেন– “প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে, স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।” ঈদ মানে প্রীতি ও প্রেম। ঈদ মানে সামাজিক শিক্ষা। ঈদ মানে খুশি ও উচ্ছ্বসিত প্রাণ। ঈদ মানে ধনীর প্রাসাদ থেকে গরিবের কুঁড়েঘর পর্যন্ত আনন্দে ভরিয়ে দেওয়া। ঈদ মানে অহিংসা, শান্তি ও সমপ্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। ঈদের শিক্ষা ও আলোয় আলোকিত হোক সবার জীবন। লেখক : শিক্ষক









