ঈদ সামনে রেখে বেড়েছে ডিজিটাল প্রতারণা

সংঘবদ্ধ সাইবারচক্র নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা সতর্ক থাকা, প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ

হাসান আকবর | সোমবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ

ঈদকে সামনে রেখে দেশে আবারও ডিজিটাল প্রতারণা চলছে। সংঘবদ্ধ সাইবারচক্র নানা কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবের নামে ভুয়া জুম মিটিংয়ের আমন্ত্রণ, কখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আপডেটের অজুহাত, কখনো মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি দেখিয়ে ওটিপি আদায় করে প্রতারণা করছে চক্রটি। ওটিপি কিংবা স্ক্রিন শেয়ারিংয়ের ফাঁদে ফেলে মুহূর্তেই দখলে নিচ্ছে ভুক্তভোগীর হোয়াটসঅ্যাপ, ইমু, ফেসবুক ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট। এরপর কল বা চ্যাট হিস্ট্রি দেখে পরিচিতদের কাছে টাকা চেয়ে বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের কেনাকাটা ও আর্থিক লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় প্রতারক চক্রগুলো এ সময়টাকে বেছে নেয়। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে প্রথমে তারা পরিচিত কোনো ক্লাব, ব্যাংক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে ‘আপনার এনআইডি দিয়ে অপরাধ হয়েছে’, ‘আপনার মোবাইল থেকে রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট করা হয়েছে’ এমন বার্তা দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়। প্রতারকচক্র সব সময় হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ফোন করে। হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইলে ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া পুলিশের ছবি লাগিয়ে দেয়। এতে করে কাউকে ফোন করলে পুলিশের ছবি ভেসে ওঠে। ফলে ভুক্তভোগী ভয় পান এবং যখন ওটিপি বা স্ক্রিন শেয়ারিং অ্যাপ চালু করেন তখনই তার মোবাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রতারকদের হাতে। তখন ওই ফোন বা ডিভাইস নিয়ে প্রতারক নিজেদের মতো করে প্রতারণা করতে থাকে।

গত কিছুদিন ধরে চট্টগ্রামে একটি প্রতারকচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশের কাছে আসা অভিযোগ থেকে জানা যায়, ০১৭৪২৭৪৪১৯২ নম্বরের প্রোফাইল পিক একজন পুলিশের। অথচ ফোনটি জালাল নামের একজন মানুষের। ছবিটি কোন পুলিশের তা কেউ বলতে পারছেন না। অথচ এই ছবি ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিপিং ব্যবসায়ী জহুর আহমেদ গতকাল আজাদীকে বলেন, পুলিশের পরিচয় দিয়ে আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। কৌশলে আমার হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করে আমার স্টাফ থেকে ১৪ হাজার টাকা বিকাশে নিয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রতারক আমার ফোনটি হ্যাক করে ফেলে। কয়েকজন শিপিং ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের সাথেও প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে। কেউ কেউ প্রতারিত হয়েছে।

অপরদিকে ‘ছোট সাজ্জাদ’, ‘শিবির ক্যাডার নাছির’ ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে ফোন করেও হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দেশিবিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রতারণার একাধিক অডিও রেকর্ড আজাদীর হাতে এসেছে। যেখানে বলা হয়েছে, আমার কয়েকজন ছেলে গুলি খেয়ে অসুস্থ। চিকিৎসা দরকার। তাদের নামে ১০/১২টি মার্ডার কেস। বাইরে যেতে পারছে না। গোপনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। বহু টাকা খরচ হচ্ছে। আপনি আমার ছেলেদের জন্য কী করতে পারবেন? ব্যবসায়ীদের অনেকে মোটা অংকের টাকা প্রতারকের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

নগরীর দেওয়ানবাজারের কে গার্মেন্টসের মালিক লায়ন বিজয় শেখর দাশকে গতকাল ০১৩০০৭৪৮২০৮ নম্বর থেকে ফোন করে ‘ছোট সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে ছেলেদের চিকিৎসার জন্য কী করতে পারবেন জানতে চেয়েছে। অবশ্য বিজয় শেখর দাশ প্রতারক বুঝতে পেরে বকা দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছেন বলে আজাদীকে জানান।

সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার টোপও বড় ফাঁদ হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ‘নিশ্চিত লাভ’, ‘এক ঘণ্টায় দ্বিগুণ’ এমন প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ছোট অংকের লাভ দেখানো হয়। পরে বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করতেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ, গ্রুপ গায়েব, নম্বর বন্ধ। অনেকে সামাজিক লজ্জা বা আইনি ঝামেলার ভয়ে অভিযোগ করেন না। ফলে প্রতারকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। অর্থাৎ মানুষের আবেগ, ভয় ও লোভকে কাজে লাগানো। প্রযুক্তি নয়, মানুষের অসতর্কতাই এখানে মূল টার্গেট। একটি ওটিপি শেয়ার করলে ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবকিছু ঝুঁকির মুখে পড়ে। স্ক্রিন শেয়ারিং অ্যাপ (যেমন অহুউবংশ বা ঞবধসঠরববিৎ ধরনের রিমোট অ্যাপ) চালু করলে প্রতারকরা সরাসরি ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

প্রতিকার হিসেবে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ইউনিটের কর্মকর্তারা। প্রথমত, কোনো অবস্থাতেই ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা ক্রেডিট বা ডেভিট কার্ডের পেছনের পাতার সিভিভি নম্বর কারো সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। ব্যাংক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো ফোনে এসব তথ্য চায় না। দ্বিতীয়ত, অপরিচিত লিংক বা অ্যাপ ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং স্ক্রিন শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে টুফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখতে হবে এবং শক্তিশালী, আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে। চতুর্থত, সন্দেহজনক কল পেলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে।

এরপরও কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, মোবাইল অপারেটর ও ব্যাংকে অবহিত করা এবং নিকটস্থ থানায় বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশের সাইবার ইউনিটের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, মোবাইল হ্যাক হয়ে গেলে পরিবার ও পরিচিতদের দ্রুত বিষয়টি জানানো, যাতে হ্যাক হওয়া আইডি থেকে টাকা চাওয়া হলে কেউ যেন তাড়াহুড়ো করে লেনদেন না করেন।

তারা বলেন, ঈদের আনন্দকে কেন্দ্র করে যেন আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক ভোগান্তি না বাড়ে, সেজন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা। প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, কেবলমাত্র সতর্কতাই ডিজিটাল প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসংসদ বসছে ১২ মার্চ
পরবর্তী নিবন্ধভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের পানি সরবরাহ করতে পাইপলাইন স্থাপন শুরু