ঈদ : সকল ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়গান গাওয়ার দিন

ইকবাল হায়দার | বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২৬ at ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ

মুসলমানদের যে দুটি দিবসকে আনন্দ ও উৎসবের দিন হিসেবে পালন করা হয় তাকেই ঈদ বলা হয়। একটি ঈদউলফিতর অন্যটি ঈদউলআজহা। অন্য অর্থে সওয়াব ও পুরস্কার দিয়ে একমাস রোজা বা সিয়াম সাধনাকারীদের পুরস্কার প্রদানের দিনকে ঈদ উল ফিতর বলা হয়। তাই ঈদ অর্থ আনন্দ, উৎসবের দিন।

ফিতর অর্থ ভাঙা। ঈদুল ফিতর হল রোজা ভাঙা বা খোলার আনন্দ, যা তিরিশ রোজা পালনকারীদের জন্য বিশেষ আনন্দের দিন ও মুসলিম উম্মার জন্য ইবাদতকারীদের নিয়ামত এবং ওয়াজিব যা অবশ্যই পালনীয়।

ইসলাম ধর্মে ঈদ উৎসবের সূচনা হয় দ্বিতীয় হিজরি সনের মাঝামাঝি সময়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে প্রথম মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করে।

বাংলা পিডিয়ার মতে, মদিনা যাওয়ার পর নবী করিম ( সঃ) দেখেন, সেখানকার মানুষেরা বছরে দুটি উৎসব পালন করে একটি ‘নওরোজ’ ও অন্যটি ‘মিহিরজান’। ওই দুটি উৎসবের আদলে তিনি মুসলমানদের জন্য বছরে দুটি ধর্মীয় সামাজিক ও জাতীয় উৎসব পালনের ধারা প্রবর্তন করেন।

নবী করিম (সঃ) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিযরত করেন। তখন থেকেই হিজরি সন গণনা করা হয়। হিজরি প্রথম বছরের অষ্টম মাস অর্থাৎ শাবান মাসে মুসলমানদের জন্য রোজা বাধ্যতামূলক করার আয়াত নাজিল হয় ও তিরিশ রোজা শেষে ঈদ উৎসব পালনকে ওয়াজিব বা অবশ্যই পালনীয় ঘোষণা করা হয়।

ঈদউলফিতর শব্দ দুটি আরবী অর্থ আনন্দ ও উৎসব।

ফিতর অর্থ বিদীর্ণ করা, উপবাস ভঙ্গ করা, স্বাভাবিক বা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসা।

আমরা জানি ঈদ মানে আনন্দ, উৎসব। আবার এটি একটি এবাদত। ত্যাগ, মহিমা, শ্রেণি বৈষম্যের মূলোৎপাটন, বুকে বুকে কোলাকুলি, হৃদয় থেকে হৃদয়ে জড়াজড়ি, সাম্য ও সমপ্রীতির অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে এ ঈদ সমগ্র মুসলিম জাহানে সমগ্র বিশ্বব্যাপী এক সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি করে। ভ্রাতৃত্ববোধ, জাতীয় ঐক্য, একে অপরকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে সাম্য প্রতিষ্ঠার উৎসব এই ঈদ। সুশৃঙ্খল জীবন যাপন, ভ্রাতৃত্ববোধের মন মানসিকতা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলতা প্রদর্শনই ঈদের মৌলিক শিক্ষা। আমরা পূর্বেই জেনেছি ঈদউলফিতর হল রোজা ভাঙ্গার উৎসব। তাই ঈদউল ফিতর রমজানের সমাপ্তিকেই চিহ্নিত করে। আমরা আরো অবগত যে ঈদ একদিকে যেমন উৎসব তেমন অন্যদিকে একটি ইবাদত। হাজি শরীয়ত উল্লাহর সময় থেকে বঙ্গে উৎসবের মাধ্যমে ঈদ উদযাপনের চল শুরু হয়। ১২০৫ সালে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঈদ পালিত হতে শুরু হয়। মোঘলরা ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় এসেছিল। তারাই এ দেশে ঈদ পালন শুরু করে উৎসব আকারে। বৃটিশ আমলে ঈদ উৎসব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। চাঁদ দেখা, নতুন জামা পোশাক আশাক পরিধান করা, রান্না, খাওয়া, কোলাকুলি, বেড়ানো, কেনাকাটা ঈদের আবহকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত, উৎসবমুখর ও নান্দনিক করে তোলে। ঈদ উৎসব তাই শত শত বছরের ইতিহাস নিয়ে জড়িয়ে গেছে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে। তাই সাম্য ও সমপ্রীতির চিহ্ন এই ঈদে আনন্দের নহর বয় শহর থেকে নগরে, গ্রামে, গঞ্জে প্রান্তরে।

বৈষম্য ও ভেদাভেদ ভোলা, ধনী গরীব, কৃষক শ্রমিক, কুলি মজুরের মধ্যে বৈসাদৃশ্য দূর করে, হিংসা, ঘৃণা, ক্ষোভ অহংকার, অহমিকা, আত্মশ্লাঘা, রাগ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ ইত্যাদি দূরীকরণ করে ঈদ উৎসব ঘটায় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্ধ্য ও সমপ্রীতির বন্ধন। ঈদ সকল ভেদাভেদ কে ভুলিয়ে মানবতার জয়গান গাওয়ার দিন। উৎসব, ইবাদত, সাম্য ও সমপ্রীতির আবহ সৃষ্টির এ দিনে চিত্ত ও হৃদয়ে আনন্দ আনারও দিন।

ঈদ মানে হাতে হাত রেখে, বুকে বুক মিলিয়ে মুসাফাহা। ঈদ ত্যাগ ও মহিমা শিক্ষার দিন। ঈদ হত দরিদ্র, এতিম, দুঃস্থ, নিঃস্ব, শত ছিন্নমূল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর দিন। ঈদ সকল মান, অভিমান, ঝগড়া বিবাদ, হিংসা, বিদ্বেষ ভোলার দিন।

এই ঈদে আনন্দ, উল্লাসে ঘরে ঘরে, জনে জনে খুশির বারতা, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, সমপ্রীতির বার্তা, সামাজিক সমপ্রীতি ও সাম্য চেতনার অপূর্ব মোহময়ী আবহ সৃষ্টির দিন। তাই ঈদ আসে সকল মুসলমানদের মাঝে বিভেদ, বৈষম্য, দূরত্ব ভুলে একে অপরকে সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতির কঠিন বন্ধনে বাঁধতে।

লেখক: গীতিকার, সংগীতশিল্পী, লোকসংগীত গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅ্যাক্রেডিটেশন সনদ লাভ : উচ্চশিক্ষায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য অর্জন
পরবর্তী নিবন্ধতুরস্ক হয়ে দেশে ফিরেছে ইরানের নারী ফুটবল দল