ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে আসা–যাওয়ার পথে কিংবা বাড়িতে থাকার সময় নানা ধরনের দুর্ঘটনার খবর প্রতিনিয়ত শোনা যায়। বিশেষ করে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঈদের ছুটিতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এই ঈদে এমন যেন না হয়, সে জন্য নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। ছুটিতে অনেক পরিবার গ্রামে বা অন্য কোথাও বেড়াতে গেছে বা যাবে। এ সময় অনাকাঙিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে, বিশেষ করে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে শিশুদের রক্ষা করতে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা নিতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে বাড়ির আশেপাশে পুকুর বা নদীতে গোসল, নৌকা ভ্রমণ বা হাওর এলাকায় ভ্রমণ এ সময় এড়িয়ে যাওয়া ভালো। যারা সাঁতার জানে না তাদের পানিতে নামা উচিৎ নয়।
প্রতিবারের মতো এবারের ঈদেও শহরের অনেকেই গ্রামে যাবে ঈদ পালন করতে। এদের একটি বড় অংশ হলো শিশু। অনেক শিশু হয়তো প্রথমবার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। শহরের পরিবেশ আর গ্রামের পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য অনেক। এ জন্য এই ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে শিশুর যত্ন নিতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি, বিশেষ করে যদি শিশুটি শহরে বড় হয়ে থাকে এবং গ্রামের পরিবেশে নতুন হয়। গ্রামে ঈদ করতে গেলে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি খেয়ালে রাখুন। পুকুরের প্রতি শিশুদের আগ্রহ থাকে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় ঘটে যেতে পারে দূর্ঘটনা। আবার অপরিচিত জায়গায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই শিশুকে নজরদারিতে রাখবেন। অপরিচিত পরিবেশে হুট করে শিশু মানিয়ে নাও নিতে পারে। তার সমস্যার কথা শুনুন। সবার সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় করান।
বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের স্বাস্থ্যনীতিতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিশুর নিরাপত্তায় পাইলট প্রকল্পে পানিতে ডুবে মৃত্যু বিবেচনা করলেও সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প এখনো সীমিত। জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে। গড়ে দিনে ৪০টি শিশু মারা যায় পানিতে ডুবে। গ্রামে বাবা–মায়েরা এত বেশি আড্ডায় মশগুল থাকে অনেক শিশুরা কোথায় যায় কার সাথে মিশে এগুলো খেয়াল রাখে না। এই সময়গুলোতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে বেশি। শিশুদের রাতের বেলায় হাঁটাহাঁটি করতে দেওয়া যাবে না কারণ বিভিন্ন পোকামাকড় কিংবা সাপ থাকতে পারে। এখন সাপের উপদ্রব খুব বেশি। রাতে হাঁটতে হলে সঙ্গে রাখুন টর্চ। গ্রামে ইলেকট্রিসিটি বেশিরভাগ সময়েই থাকে না। পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যাওয়া ভালো। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে সঙ্গে রাখুন মশার ওষুধ।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। যা মোট শিশুমৃত্যুর ২৮ ভাগ। এই মৃত্যুর বেশির ভাগ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য ও তথ্য জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, বছরে ১ থেকে ১৭ বছর বয়সি ১৪ হাজার ৪৩৮ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশু ও কিশোরদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া, যা বর্তমানে একটি অবহেলিত জাতীয় সংকট বলে জানান বিজ্ঞজনেরা।
গ্রামে এখনও অনেক জায়গায় টিনের গ্লাস বা ভাঙা কাঁচের বাসন ব্যবহার হয়। এসব শিশুদের হাতে দিলে হাত কেটে যেতে পারে। পাশাপাশি, তারা খেলতে খেলতে পুরোনো জিনিসে হাত দিলে সেখান থেকেও চোট পেতে পারে। তাই নিশ্চিত করুন তারা যেন শুধুমাত্র প্লাস্টিক বা স্টিলের নিরাপদ পাত্রই ব্যবহার করে।
গ্রামের উঠোন, ধান গাদা, বাঁশঝাড় বা সিঁড়ির ধাপ–এসব জায়গা শিশুদের কাছে দারুণ রোমাঞ্চকর। কিন্তু সঠিক নজরদারি না থাকলে এসব স্থানেই তারা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে পারে। ছোটদের চলাচলের জায়গাগুলো নিরাপদ কি না দেখে নিন। খুব বেশি উচ্চতা বা পিচ্ছিল জায়গায় শিশুদের একা যেতে দেবেন না। সবসময় সঙ্গে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম (ঋরৎংঃ অরফ করঃ) রাখুন। যেমন–অ্যান্টিসেপ্টিক, ব্যান্ডেজ, তুলা, গ্যাসট্রিক বা জ্বরের ওষুধ ইত্যাদি। গ্রামের অনেক জায়গায় নিকটস্থ ফার্মেসি পাওয়া যায় না, তাই আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা জরুরি।
ঈদে গ্রামের বাড়িতে শিশুদের সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের আমরা প্রকৃতির সঙ্গে কিংবা গ্রাম্যজীবনের লোকসংস্কৃতি–ইতিহাস–ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করাতে পারি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদী। বাড়ি থেকে নিকট দূরত্বে যে নদী আছে, সেই নদীর পাশে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে যেতে পারি, যদি নদীটিতে পানি নাুও থাকে। আমরা আমাদের শৈশবে নদীটি কেমন দেখেছি, আমাদের বাবার কাছে নদীটির কেমন গল্প শুনেছি, সেই গল্প শোনাতে পারি। আমরা সন্তানকে বোঝাতে পারি, নদীর সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক কত গভীরের। নদীগুলো ছাড়া বাংলাদেশ যে অচল, এ ধারণা সন্তানদের মধ্যে দিতে পারি।
পাখি সম্পর্কেও আমরা সন্তানদের ধারণা দিতে পারি। বুলবুলি, ফিঙে, টিয়া, চড়ুই, বাবুইসহ যেসব পাখির নাম বইয়ে পড়েছে, সেগুলো বাস্তবে দেখাতে পারি। কোন পাখি কোথায় বাসা বাঁধে, কী খায়–এসব ধারণা বাস্তবে পেতে পারে আমাদের সন্তানেরা। পাখি কীভাবে তার সন্তানকে বড় করে তোলে, সে ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের প্রতি মা পাখির যে ভালোবাসা, সেটি নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। বাবুই পাখির বাসা সন্তানদের দেখানো খুব জরুরি। পাখিরাও যে কত নিখুঁত শিল্পী, সেটা বোঝানো যাবে।
ঈদুল ফিতর গ্রামে–শহরে আনন্দময় ও সবার সাথে সুন্দর কাটুক। অনাকাঙ্খিত বিপদ এড়াতে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। সবাইকে ঈদ মোবারক।
লেখক: শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক












