আওয়ামী লীগকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে সবশেষ তিন সংসদ নির্বাচন আয়োজনের অভিনব মহাপরিকল্পনা করা হয়, যা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে এ বিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিন নির্বাচনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তে গঠিত জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন গতকাল সোমবার এ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের প্রধান হাই কোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন বলে সংবাদ ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। খবর বিডিনিউজের।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এর তিন নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তিন সংসদ নির্বাচন ঘিরে ওঠা অভিযোগ পর্যালোচনা এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে সরকার। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যালোচনায় গত ২৬ জুন এ কমিটি করা হয়। পরে ক্ষমতা বাড়িয়ে এটিকে কমিশনে রূপান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন কমিশনকে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়। পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। হাই কোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
গতকাল সন্ধ্যায় যমুনার সামনে ব্রিফিংয়ে এসে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সংস্কারের জন্য যে সকল কমিশন করা হয়েছিল, আজকে তার শেষ কমিশনের সব প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। এই কমিশনটা হলো, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর উপর তদন্ত কমিশন।
ব্রিফিংয়ে কমিশনের প্রধান বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর তিনটা ইলেকশন বটে, কিন্তু এটার মাস্টার প্লান একটা। এই মাস্টার প্লানটা হয়েছে ২০০৮ সালের পরে। ওই নির্বাচনের পরে, ওখান থেকে একটা পরিকল্পনা ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারটা বাতিল করা। পরে ২০১১ সালে ওটা বাতিল করা হয়। ওই সময়ে ওটা বাতিল করার পেছনে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। ইভেনচুয়ালি রুলিং পার্টি যতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে যেকোনো স্ট্রাটেজিতে যেকোনোভাবে তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা বাধা ছিল। পদ্ধতিটা বাতিল করার পরে যে নির্বাচনটা হলো তার সমস্তকিছু স্বচ্ছভাবে আমাদের প্রতিবেদনে এসেছে।
বাসস জানায়, তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা ছিল। এর ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে নেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল।












