আমরা সকলে কমবেশি তাঁকে চিনি। তাঁর জন্ম কোথায়, বিবাহ কখন, কার সাথে বিবাহ এগুলোও কমবেশি সবার জানা। কিন্তু আজ আমি যে বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখতে চাইছি সেটি হলো ১৪০০ বছর আগেও একজন নারী কেমন আধুনিক ছিলেন? যে যুগে নারী ছিল চরম অবহেলিত।
বলছি হজরত খাদিজা (রা.)’র কথা। তিনিই প্রথম মুসলিম, যিনি সমগ্র সম্পদ সবার আগে ইসলামের জন্য দান করেছিলেন, তিনিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী সর্বোপরি সমগ্র আওলাদে রাসুলদের (নবি বংশধর) প্রবহমান রক্তধারার জন্মদায়িনী মাতা। যাঁর সম্পর্কে রবার্ট হোইল্যান্ড নামে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক বলেন, ‘খাদিজা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও অত্যন্ত দৃঢ় ইচ্ছা শক্তিসম্পন্ন একজন নারী’। বিষয়টি কি আমরা কখন ভেবে দেখেছি?
রবার্ট হোইল্যান্ডের কথাটির প্রমাণ মেলে হজরত খাদিজা (রা.) জীবনের নানা সময়ের ঘটনায়। যে বিষয়গুলো ১৪০০ বছর পরও নারীদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
প্রথমেই আসি বিবাহ নিয়ে। তিনি ছিলেন আরবদের মধ্যে অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও একজন স্বাধীন উদ্যোক্তা। যাঁর পিতাও ছিলেন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। যুদ্ধে পিতা নিহত হলে পিতার ব্যবসা বাণিজ্যের ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করেন। প্রথম স্বামীর ইন্তেকালের পর আরবের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো তিনি সে প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এমনকি সেকালের আরবের ঐতিহ্য অনুসারে তিনি তাঁর দূরসম্পর্কীত ভাইদের বিয়ে করতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন নিজেই তাঁর জীবনসঙ্গী বেছে নিবেন। ঠিক যেমন ভাবনা তেমন কাজ। তিনি বিয়ে করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। হজরত খাদিজা (রা.) একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নারী ছিলেন। তাইতো তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো ব্যক্তিকে বিবাহের প্রস্তাব দেন নিজে থেকেই। কী দেখে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিবাহ করেন? টাকা–পয়সা, ধন–দৌলত, বাড়ি–গাড়ি, জায়গা–জমি! আসলে তিনি যা দেখে বিয়ে করেছিলেন সেগুলো দেখে খুব কম নারীই বিয়ে করেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিয়ে করেন তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা, সাহসিকতা, ধৈর্য ও পরিশ্রম করতে পারেন এমন মানসিকতা দেখে। তিনি পারিবারিক সূত্রে যে অঢেল ধনসম্পত্তি লাভ করেছিলেন তা দিয়ে বহু বছর কাটিয়ে দিতে পারতেন কিন্তু তা করেননি। বরং নিজে দক্ষ হাতে ব্যবসা পরিচালনা করে তা বিস্তৃতও করেছিলেন। কিন্তু ব্যবসা বিস্তৃত করতে গিয়ে অভাববোধ করলেন দক্ষ, সৎ ও বিশ্বস্ত একজন সঙ্গীর। এ ধারাবাহিকতায় তিনি পেয়ে যান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো একজন সৎ, দক্ষ ও বিশ্বস্ত সঙ্গী। এর প্রমাণ মেলে যখন খাদিজা (রা.) সফরসঙ্গীরদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততা ও ব্যক্তিত্বের কথা শোনেন, যা তাঁকে আরো আস্থাশীল করে তোলে। সেসময় মক্কা থেকে উত্তরে রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কাফেলা প্রেরণ করা হতো। এসব কাফেলায় থাকত পশুর চামড়া, পশমি কাপড়, আর সুগন্ধি পণ্য সামগ্রীর চালান। হজরত খাদিজা ( রা.)’র ছিল সেরকম কাফেলা। তাঁর পণ্যের গ্রাহক ছিল সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের সেনাবাহিনী। শৈশবে পিতামাতা হারানো এই তরুণের ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা, কঠোর পরিশ্রম, চারিত্রিক দৃঢ়তা আর আলোকময় পদচারণা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি নিজে থেকেই বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা সাদরে গ্রহণ করেন। অত্যন্ত সুখ–শান্তিতে দিন কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ ৬১০ খ্রি: চল্লিশ বছর বয়সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহি নাজিল হলো সেই হেরা পর্বতের গুহায়। যখন হজরত জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে ওহি লাভ করে তখন ঘরে এসে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিলেন ঠিক সেসময় তাঁকে একমাত্র সাহস জুগিয়েছিলেন স্ত্রী হজরত খাদিজা ( রা.)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবি খাদিজা (রা.) এঁর কোলে মাথা রেখে সূর্যোদয় পর্যন্ত তাঁকে জড়িয়ে ধরে রাখেন, ভয় কেটে যাওয়া পর্যন্ত। হেরা পর্বতের গুহায় জিবরাইল ( আ.)’র সাথে যে কথাগুলো হয়েছিল সব কথাই হজরত খাদিজা (রা.) অকপটে বিশ্বাস করেন। আসলে এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি বিবি খাদিজা (রা.) স্বামীকে নিয়ে কতটা দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, যা নবুয়ত– পরবর্তী আচরণে তা আমরা দেখতে পায়। এভাবে হজরত খাদিজা (রা.) ই প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এমনকি প্রথম ওহি লাভের ঘটনা শুনে তিনি এখানেই থেমে যাননি, তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের সাথে এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন। যিনি ছিলেন মক্কার হানিফ সমপ্রদায়ের একজন অন্যতম সদস্য যারা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর শিক্ষার উপর নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখার প্রয়াস চালান। ওয়ারাকাও আরবদের মধ্যে থেকে একজন নবীর আগমনের কথা শুনেছিলেন। বিবি খাদিজা (রা.)’র কাছ থেকে সব শুনে তিনি স্বামীর প্রতি আরো যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিলেন। সে সময় মক্কার দুরবস্থা বিমর্ষ করত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তখন তিনি নানা বিষয়ে খাদিজার (রা.) কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। ভরসা করতেন। স্ত্রীর কাছ থেকেই পেতেন সাহস আর শক্তি। হেরা পর্বতের একাগ্রচিত্তে ধ্যানমগ্নতায় যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য খাদিজা ( রা.) হেরা গুহায় নিয়মিত খাবার নিয়ে যেতেন। একবার ভাবুন তো হেরা পর্বতের পথটা কেমন ছিল? এমন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চাইলে পারতেন অন্যকাউকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি তা করেননি! নবুয়তপ্রাপ্তির পর খাদিজা (রা.) চাইতেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন পুরোপুরি ইসলাম প্রচারে মনোযোগ দিতে পারেন। সেজন্য তিনি ব্যবসা বাণিজ্য নিজেই সামলিয়েছেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকেও ব্যবহার করেছেন। ইসলামের খেদমতে হজরত খাদিজা (রা.) অবদান অতুলনীয়।
লেখক: প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ











