ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের টানা ৪০ দিনের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি চলাকালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান–মার্কিন শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকালে ইসলামাবাদে এ আলোচনার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। গতকাল প্রথম দফার আলোচনা শেষ হয়। আড়াই ঘণ্টার এই আলোচনায় পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরাও উপস্থিত ছিলেন। একটি সূত্র অনুযায়ী, প্রাথমিক আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। সংক্ষিপ্ত বিরতির পর ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আজ রোববার পাকিস্তানের স্থানীয় সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে পুনরায় শুরু হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তার মতে, এই পর্যায়ে দুই পক্ষের দেওয়া প্রস্তাবগুলোর কারিগরি দিকগুলো পর্যালোচনা করা হবে। খবর বিবিসি বাংলা, বাংলানিউজ ও বিডিনিউজের।
হোয়াইট হাউস প্রেস পুলের এক প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ইসলামাবাদে উপস্থিত রয়েছেন। পাশাপাশি ওয়াশিংটন থেকে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামাবাদে আসা ইরানি প্রতিনিধিদলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. নাসের হেম্মতিসহ বিভিন্ন কারিগরি বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন।
আলোচনার জন্য একটি সাধারণ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা এখন লিখিত বার্তা বিনিময় করছেন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থানরত প্রতিনিধিকে উদ্ধৃত করে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সচরাচর ওয়াশিংটন যে রকম মাত্রাতিরিক্ত দাবি করে তার কারণে অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও আলোচনা অব্যাহত আছে, কিন্তু যে বিষয়গুলো নিয়ে গুরুতর মতভেদ দেখা দিয়েছে তার মধ্যে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি অন্যতম।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, পাকিস্তানে থাকা ইরানের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সর্বশক্তি দিয়ে ইরানের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং এ কাজে সাহসের সঙ্গে নিয়োজিত থাকবে। সামাজিক মাধ্যম এঙে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই জনগণের সেবা বন্ধ হবে না এবং আলোচনার ফল যাই হোক না কেন, সরকার জনগণের পাশে থাকবে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদলের মুখোমুখি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিষয়ের মার্কিন বিশেষজ্ঞরাও ইসলামাবাদে উপস্থিত আছেন এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা ওয়াশিংটন ডিসি থেকে সহায়তা করছেন।
বৈঠকে কী হলো : ইরানের তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, বর্তমানে নিবিড় আলোচনা চলছে। বৈরুত থেকে দক্ষিণ লেবানন পর্যন্ত জায়নিস্ট শাসনের (ইসরায়েল) হামলা সীমিত হওয়া, যাকে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন পক্ষ রাজি হওয়ায় এ বৈঠক হচ্ছে। এসব বিষয়ে আরো নিখুঁত ও কৌশলগত আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় এগুলো চূড়ান্ত করতে ইসলামাবাদে এ বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইরান মনে করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তেহরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিশ্রুতি পূরণে ইসরায়েলি সরকারকে বাধ্য করতে দায়বদ্ধ। ইরানি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এবং আলোচনার টেবিলে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছে।
ইরানি প্রতিনিধিদল প্রতিপক্ষের ওপর গভীর সন্দেহ পোষণ করছে। এর আগে বিভিন্ন আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় ইরান এবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ দফার আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডারকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ওই অঞ্চলে এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল একটি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইসলামাবাদে এ আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। ইরান আলোচনার জন্য একটি ১০ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছে, যার মধ্যে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি রয়েছে। ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবিশ্বাস বজায় রেখেছে। তাদের মতে, এই আলোচনার উদ্দেশ্য সংঘাত মেটানো নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রকে কূটনৈতিক ময়দানে স্থানান্তরিত করা।
এদিকে ইসলামাবাদে একদিনে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল, যা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘিরে নতুন কূটনৈতিক হিসাব–নিকাশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হোয়াইট হাউজ নিশ্চিত করেছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। এ প্রেক্ষাপটে মূল বৈঠকের আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলে আরো উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
একই দিন ইরানের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে আসা এ দলে ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্যমতে, বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকগুলো ঘিরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্ভাব্য আলোচনার আগে আঞ্চলিক কৌশল, মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ আশা প্রকাশ করেন, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বয়ে আনতে পারে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজের হরমুজ অতিক্রমের দাবি ইরানের প্রত্যাখ্যান : যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে–সংবাদমাধ্যমে অ্যাঙিওস এক অনামা মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এমন খবর জানালেও তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা ওই খবর অস্বীকার করেছেন।
তাসনিম লিখেছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসী যুদ্ধে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এ দাবিটি করা হলো। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে তারপর থেকে কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমায়েল বাগায়ি ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিংকে (আইআরআইবি) জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়েছে।
তাসনিম জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যে ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন তা হলো, একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালির দিকে এগোতে শুরু করেছিল, কিন্তু তা দ্রুতই ইরানি সামরিক বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজটির অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আর এ বিষয়ক প্রতিবেদন পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ইরানি প্রতিনিধিদল অবিলম্বে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিষয়টি মার্কিন পক্ষকে অবহিত করে। একই সময় ইরানি বাহিনীর পক্ষ থেকে ওই মার্কিন যুদ্ধজাহাজটিকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়, যদি এটি হরমুজ প্রণালির দিকে এগোতে থাকে তাহলে ডেস্ট্রয়ারটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরান স্পষ্টভাবে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীকে জানিয়ে দেয়, যদি জাহাজটি এগোনো অব্যাহত রাখে, তাহলে ৩০ মিনিটের মধ্যে এটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে আর তাতে ইরান–মার্কিন আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় প্রতিক্রিয়া ও আলোচক প্রতিনিধিদলের জানানো হুঁশিয়ারি খবর পাওয়ার পর মার্কিন জাহাজটিকে থামার আদেশ দেওয়া হয়। তাসনিম লিখেছে, ইরানের এই দায়িত্বশীল অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ, যা সশস্ত্র বাহিনী ও কূটনৈতিক মিশনের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের বিষয়টি তুলে ধরেছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারী তার প্রশংসা করেছেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।












