ইরান যুদ্ধে ইউরোপের ভূমিকায় প্রশ্নের মুখে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ

| মঙ্গলবার , ৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

ইরানের সঙ্গে উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা সংঘাত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অন্যতম মূলনীতি ‘আন্তঃজোট সংহতি’কে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন, তখন ইউরোপের প্রধান দেশগুলো এক ধরনের সতর্ক, সংযত ও সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে। খবর বিডিনিউজের।

এই ব্যবধান নিছক কৌশলগত নয়, এটি ন্যাটো জোটের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। ইউরোপ যখন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতির পরও ট্রাম্পকে বলে, এটি (ইরান) আমাদের যুদ্ধ নয়, তখন বড় ধরনের এক কৌশলগত ফাটলই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এর তুলনাটি বেশ প্রখর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের আহ্বানে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট যদি একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতেন, তবে এই মহাদেশের ভাগ্য আজ আমূল ভিন্ন হতে পারত। আজ হয়ত হিটলারের উত্তরসূরিরাই পুরো ইউরোপ শাসন করত।

আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বনাম বৈশ্বিক সংঘাত : ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপের সুরক্ষা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে ন্যাটো গঠিত হয়েছিল। এর নির্দেশক নীতি ‘আর্টিকেল ৫’ অনুযায়ী, কোনও এক সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানেই সবার ওপর আক্রমণ।

তবে বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোর ভূমিকাকে কেবল প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। তারা ইরানের মতো বৈশ্বিক হুমকির বিরুদ্ধে জোটকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপের অবস্থান হলো, এই মহাদেশের বাইরের প্রতিটি সংঘাতই ন্যাটোর হস্তক্ষেপের দাবি রাখে না। তারা উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার পক্ষে কথা বলছে। এর ফলশ্রুতিতে ওয়াশিংটন এবং ইউরোপীয় দেশের রাজধানীগুলোর মধ্যে এক গভীর ধারণাগত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

ওয়াশিংটন হতাশ হচ্ছে মূলত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে নিয়ে; যাদেরকে মনে করা হচ্ছে তারা বোঝার ন্যায্য ভাগ বহন করছে না। এই ধারণা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও সংহতি নষ্ট করছে এবং জোটকে একটি মূল্যবোধভিত্তিক জোট থেকে অনেকটা ‘শর্তাধীন অংশীদারিত্বে’ রূপান্তর করছে।

ট্রাম্প তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, যারা ইরান যুদ্ধে অংশ নেবে না, তারা পূর্ণ সুরক্ষাও আশা করতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের হুমকি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এটি গোটা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য হুমকি। তার মতে, ইউরোপ এই লড়াইয়ে যথেষ্ট অবদান রাখছে না।

ট্রাম্প কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, ইউরোপের সক্রিয় অংশগ্রহণ দাবি করেছেন এবং শুধু কূটনৈতিক দিক থেকে নিন্দার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সমালোচনা করেছেন। এই চাপের অংশ হিসেবে তিনি ন্যাটোর অন্যান্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেসব দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হবে তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার নিশ্চয়তা নাও থাকতে পারে।

অর্থনৈতিক চাপ ও ইউরোপীয় স্বায়ত্তশাসন : ট্রাম্প নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার যুক্তি হল, নিরাপত্তা খাতে অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক ঘাটতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দুইবার লোকসান গুনছে। তার এই বার্তা বহুপাক্ষিকতা থেকে একটি লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা হলো যারা অবদান রাখবে না, তারা পূর্ণ সুরক্ষা নাও পেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনই তাদের সব প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম থাকলেও, স্বল্প মেয়াদে ইউরোপের ওপর চাপ যে বাড়বে তার লক্ষণ স্পষ্ট। দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিস্থিতি ইউরোপকে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন লাভ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

ন্যাটো সংকট নাকি রূপান্তর? : নেটো এখনই ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে নেই, তবে এটি একটি গভীর অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। একটি আরও সক্রিয় এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত জোটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এবং ইউরোপের সতর্ক ও পরিমিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব ন্যাটোতে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।

ট্রাম্প মূলত ন্যাটোকে ইউরোপের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও সক্রিয় এবং দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেওয়া একটি জোটে রূপান্তর করতে চাইছেন। অন্যদিকে, ইউরোপ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাবলম্বী হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যদি এই বিভাজন বজায় থাকে, তবে নেটো হয়ত বিলুপ্ত হবে না, কিন্তু জোটটির মৌলিক রূপ এবং চরিত্র আমূল বদলে যেতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঋণের সুদ আবারও এক অঙ্কে আনার দাবি ব্যবসায়ীদের
পরবর্তী নিবন্ধক্ষুদ্র কৃষকের ঋণ মওকুফে ১,৫৬৭.৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ