পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ইরান–যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা। যা ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতূহল ও অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে মতবিরোধের মধ্যেই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বসতে যাচ্ছে। আলোচনার আগে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ও তাদের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত না হলে সংলাপ শুরু হবে না; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসলামাবাদের বৈঠক ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই বৈঠকটি আদৌ ফলপ্রসূ হবে কিনা, তা নিয়ে বাড়ছে সংশয়। এরই মধ্যে ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, ‘রেড জোন’ এলাকায় চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর এখন এই সংলাপের দিকেই।
বিবিসি জানিয়েছে, আলোচনায় প্রতিনিধিদলে কে বা কারা থাকবেন, তারা কখন ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন কিংবা কীভাবে আলোচনা হবে–এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ইসলামাবাদে সরকারি ভবন ও বিভিন্ন দূতাবাস থাকা রাজধানীর ‘রেড জোন’ এলাকা সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এখন তা সব ধরনের মানুষ ও যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি বন্ধ। রেড জোনের আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্যামেরা হাতে দেশি–বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। পাকিস্তান সরকার সাংবাদিকদের জন্য জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টার বরাদ্দ দিয়েছে। এরইমধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এয়ার ফোর্স টু–তে করে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা হবে কিনা, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির অভিযোগ তুলেছে ইরান। অন্যদিকে যুদ্ধ বিরতির চুক্তিতে লেবানন না থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এনিয়ে কোনো মন্তব্যই করেনি ইসরায়েল। চুক্তিভঙ্গের বিষয়ে পরস্পরের দিকে আঙ্গুল তুললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা আলোচনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে শর্ত পূরণ না হলে কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারিও এসেছে উভয় পক্ষ থেকেই।
ইরানের দুটি শর্ত এখনো পূরণ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এঙে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, আলোচনার আগে উভয় পক্ষের সম্মত হওয়া দুইটি পদক্ষেপ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। যার একটি হলো, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং অন্যটি ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা। আলোচনা শুরুর আগে এই দুটি বিষয়ের বাস্তবায়ন হতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে গালিবাফ নিজেও ইরানের আলোচনাকারী দলের অংশ হতে পারেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে, ‘দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আসন্ন আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার ইরানে হামলা চালানো হবে। ইরানে আঘাত হানার প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলোতে এরই মধ্যে অস্ত্রশস্ত্র তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বলেন, আমাদের নতুন করে শুরুর কাজ চলছে। আমরা জাহাজে এ পর্যন্ত আমাদের তৈরি করা শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলছি। আগে আমরা যা করেছিলাম, তার চেয়ে আরও বেশিকিছু করা হবে। আগের হামলায় আমরা তাদেরকে (ইরান) উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আর ইসলামাবাদে যদি একটি চুক্তি না হয়, তবে আমাদের শেষ্ঠ অস্ত্রশস্ত্রগুলো আমরা অতি কার্যকরভাবে ব্যবহার করব।
অপরদিকে, ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাই পাকিস্তানে আসন্ন আলোচনার ভিত্তি হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মাজিদ তাখত–রাভানচি। তিনি বলেছেন, এই বিষয়ে সম্মতি এসেছে যে, আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাকে গ্রহণ করা হবে। তেহরানে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনৈতিক মিশনের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে তাখত– রাভানচি বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সবসময় কূটনীতি ও সংলাপকে স্বাগত জানায়। তবে তা এমন কোনো সংলাপ নয়, যা ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক আগ্রাসনের পথ তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন কোনো যুদ্ধবিরতি চাই না, যা আগ্রাসী পক্ষকে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আবার হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে। আমরা আমাদের বন্ধুদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, কোনো ধরনের নিশ্চয়তা ছাড়া এমন পরিস্থিতি আর মেনে নেওয়া হবে না।
তবে দুই দিন আগে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই ১০ দফা পরিকল্পনাকে ‘পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান’ করেছেন। তাখত–রাভানচি তার বক্তব্যে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানানো দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং কিছু ইউরোপীয় দেশের অবস্থানকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের আধিপত্যবাদ ও যুদ্ধংদেহী নীতি পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি।
ইরানে যুদ্ধে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংস্থাটির প্রধান পিরহোসেইন কলিভান্দ দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, সারা দেশে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ আবাসিক স্থাপনা, যেগুলোর কিছু অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া ২৩ হাজার ৫০০টি বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলো সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহের স্থান ছিল। তিনি আরও জানান, হাসপাতাল, ফার্মেসি, ল্যাবরেটরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জরুরি সেবাকেন্দ্রসহ মোট ৩৯৯টি চিকিৎসা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলিভান্দ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৮৭৫টি শিক্ষা কেন্দ্র ও স্কুল এবং ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় হামলার শিকার হয়েছে।
এছাড়া, রেড ক্রিসেন্টের ২০টি কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, রেড ক্রিসেন্টের শাখা, ঘাঁটি বা গুদামের মতো ২০টি কেন্দ্রকে সরাসরি টার্গেট করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তেহরান কার্যত এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে এই নৌপথ পুনরায় চালুর দাবি জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা মেনেও নেয় ইরান। তবে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল চলাচলের বিষয়ে ‘খুব বাজে কাজ’ করছে। এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ‘ট্যাংকার থেকে ইরান যেন ফি না নেয়।
বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই অন্তত নয়টি জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৮টি জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে যাতায়াত করত। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও সৌদি আরব সফর শেষে প্রণালিটি পুনরায় সচল করতে ‘বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা’ প্রয়োজনের দিকটিতেই গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
এদিকে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, অঞ্চলটিতে তারা প্রায় ২০ হাজার নাবিককে সহায়তা করছে, যাদের অনেকেই এখনো জাহাজে আটকে আছেন এবং প্রণালি ছেড়ে বের হতে পারছেন না। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমে গেলেও এখনো প্রতি ব্যারেলের মূল্য প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে।













