ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে প্রকাশ্য মতভেদ ও অস্থিরতার ইঙ্গিত মিলেছে। চলমান অভিযানের বৈধতা ও নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারটেরোরিজম সেন্টারের প্রধান জোসেফ কেন্ট। গতকাল মঙ্গলবার পদত্যাগপত্র জমা দেন কেন্ট। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বিবেকের তাড়নায় তিনি ইরানবিষয়ক সামরিক অভিযান সমর্থন করতে পারছেন না। তার ভাষায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না। তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েল ও প্রভাবশালী লবির চাপের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি একই বক্তব্য প্রকাশ করেন।
তবে জোসেফ কেন্টের পদত্যাগের পর হোয়াইট হাউস তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে একাধিক ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরিকল্পনা করছিল–এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে অকাট্য প্রমাণ ছিল। তার মতে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসার বহু সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ পদক্ষেপ আমেরিকানদের ঝুঁকি কমানোর জন্যই নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকে এ পদক্ষেপকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা মহলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেন্টের পদত্যাগে অনেক কর্মকর্তা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী সামরিক অভিযান শুরু করতে ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’র যুক্তিসংগত ভিত্তি প্রয়োজন হয়। কেন্টের বক্তব্য সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ইউরোপের কয়েকটি দেশও প্রকাশ্যে জানিয়েছে, এই সংঘাত তাদের নয়। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার লক্ষ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়ের উদ্যোগ চলছে। তবে বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা থেকে বিরত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের : এদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো উত্তেজনা হ্রাস বা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনি। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সর্বোচ্চ নেতা দাবি করেছেন, যুদ্ধ বন্ধ করার আগে প্রথমেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নতজানু’ হতে হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, মুজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতার হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথম পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান নিয়েছেন তিনি। তবে বৈঠকে তিনি সশরীর উপস্থিত ছিলেন কি না, তা ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, দুটি মধ্যস্থতাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাস বা যুদ্ধবিরতি করার প্রস্তাব ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে তিনি মধ্যস্থতাকারী দেশ বা প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সমপ্রচার মাধ্যম জানিয়েছে, ইরান থেকে ‘অধিকৃত অঞ্চলগুলোর’ দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শত্রুপক্ষের পাঠানো শত শত স্টারলিংক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করেছে তারা। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এখানে শত্রুপক্ষ বলতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বোঝানো হয়েছে
উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলার ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাহ গ্যাস ফিল্ডের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ফুজাইরাহ বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। কাতার জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। দুবাইতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরাকের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই : ইরান যুদ্ধ নিয়ে ন্যাটো মিত্রদের ওপর নাখোশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর বেশিরভাগই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। ট্রুথ সোশালে একথা লিখেছেন ট্রাম্প। তবে ন্যাটো মিত্রদের আচরণে আশ্চর্য না হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ন্যাটোকে তিনি সবসময়ই ‘একতরফা সুবিধাবাদী’ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধে যেহেতু আমরা ব্যাপক সামরিক সাফল্য অর্জন করেছি, তাই আমাদের আর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সহায়তার কোনো ‘প্রয়োজন’ বা ‘আকাঙ্ক্ষা নেই’। জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। বস্তুত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি বলছি, আমাদের কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই!
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ২,৫০০ নৌ–সেনা (মেরিন) এবং একটি উভচর যান পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। জাপানের ওকিনাওয়ায় মোতায়েন থাকা ৩১তম মেরিন এঙপিডিশনাল ইউনিটের সদস্য এবং উভচরযান ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’–কে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেরিন এঙপিডিশনাল ইউনিটের সদস্যরা সাধারণত সমুদ্রপথে অবতরণ, দূতাবাস সুরক্ষা এবং উদ্ধার ও ত্রানকাজে পারদর্শী। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং আটটি ডেস্ট্রয়ারসহ ১২টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া আল–উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে বর্তমানে প্রায় ৮,০০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের কারও কারও আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলতে পারে আঁচ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান আরও জোরদার করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন। সেকারণেই হয়ত নতুন করে এই সেনা ও উভচার যান পাঠানো। যুদ্ধ–পরিস্থিতিতে উভচর যান থেকে সাধারণত পদাতিক বাহিনী স্থলভূমিতে অবতরণ করে। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী পারস্য এবং ওমান উপসাগরের পথে ইরানে স্থল অভিযান শুরু করতে পারে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে।












