মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাইরে সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধের আশঙ্কা সামনে রেখে ইরান ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। দেশটির আধা–সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের দাবি, অন্তত ১০ লাখের বেশি তরুণ স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন এবং তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইরানের সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যৌথভাবে এই নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভিন্ন শহরের নিয়োগকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে। ইরানি সূত্রগুলো বলছে, তরুণদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক ধরনের উগ্র উৎসাহ তৈরি হয়েছে এবং তারা মার্কিন বাহিনীর জন্য ‘ঐতিহাসিক নরক’ তৈরি করতে প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট–তেহরান কোনো অবস্থাতেই পিছু হটার মানসিকতায় নেই। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্ভাব্য সব ধরনের সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিলেও ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনাও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে অঞ্চলটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। সামপ্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আরও কয়েক হাজার সেনা, বিশেষ করে মেরিন ইউনিট ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সদস্যদের পাঠানো হয়েছে। এখন পেন্টাগন আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প বাড়ানো হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনে স্থলসেনা পাঠানো অপরিহার্য নয়। তার ভাষায়, আমরা সপ্তাহের কথা বলছি, মাস নয়। অর্থাৎ দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটতে পারে বলে ওয়াশিংটনের ধারণা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। এর পরপরই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে ইরান, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যার কিছু প্রতিহত করা সম্ভব হলেও বাকিগুলো নির্জন এলাকায় আঘাত হানে। বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শত শত ড্রোন প্রতিহত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একাধিক হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে।
ইসরায়েলও সংঘাতে সরাসরি জড়িত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা তেহরানের কেন্দ্রস্থলসহ একাধিক কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও রয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আগামী দিনগুলোতে হামলা আরও তীব্র হবে এবং ইরানকে চড়া মূল্য দিতে হবে।
সংঘাতের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো বেসামরিক স্থাপনা নিয়ে নতুন হুমকি। ইরানের ফারস বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে বিভিন্ন হোটেল ও বেসামরিক স্থাপনায় আশ্রয় নিচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যে কোনো হোটেল বা স্থাপনায় মার্কিন সেনাদের আশ্রয় দেওয়া হলে সেটিকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে সাধারণ নাগরিক ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। খোন্দাব হেভি ওয়াটার কমপ্লেক্স এবং ইয়াজদের একটি ইয়েলোকেক উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়ায়নি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি।
সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বোমা হামলায়। এতে ১১০ শিশুসহ মোট ১৬৮ জন নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক এই ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি সম্ভবত অনিচ্ছাকৃত হামলা হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি।
এদিকে চার সপ্তাহের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক ব্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রথম ১৬ দিনেই প্রায় ১১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগন ইতোমধ্যে কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চেয়েছে। তবে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে এই অর্থ অনুমোদন অনিশ্চিত। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত অস্ত্রের মজুদ কমে আসছে এবং প্রয়োজনে তাদের ‘ডাম্ব বম্ব’ ব্যবহার করতে হতে পারে, যা কম নির্ভুল।
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ থেকেই আলোচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে, যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরানের কাছ থেকে একটি পাল্টা প্রস্তাব আসতে পারে। তবে একই সঙ্গে উভয় পক্ষই সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে চলেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিশ্চিত ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করছে।












