ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের যৌথ হামলায় সারা বিশ্বের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রোরবার পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানে সামপ্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ স্পষ্ট করে বলেছে, এ যুদ্ধাবস্থা অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ বেসামরিক জনগণের কল্যাণ চরমভাবে বিপন্ন হবে। বাহরাইন, ইরাক, জর্দান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মতপার্থক্য নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে দ্রুত আলোচনার টেবিলে অর্থাৎ কূটনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আশা করে, যত দ্রুত সম্ভব শান্তি বিরাজ করবে এবং এ অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা শিগগিরই ফিরিয়ে আনা হবে।
বিশ্বনেতৃবৃন্দ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে। তাঁরা সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান এই পরিস্থিতির অবনতি সবার জন্যই বিপজ্জনক। এটি অবশ্যই থামাতে হবে।’ তাঁরা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন ও স্বীকৃত আইনি কাঠামোর তোয়াক্কা না করে জাতীয় নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে হত্যার যে প্রবণতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, তা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে, বৈশ্বিক নীতিমালা দুর্বল করে এবং অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও আইনহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।’ তাঁরা উল্লেখ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ এবং বৃহত্তর বিশ্ববাসী আরেকটি বিধ্বংসী যুদ্ধ কামনা করে না। তারা চায় শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। সংযম ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে বৃহত্তর অঞ্চল আরও বিস্তৃত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।’
সবচেয়ে বড় উৎকণ্ঠার বিষয় হলো জ্বালানি তেলের দামে বড় লাফ, আরও বাড়ার শঙ্কা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান, বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দেন, ইরানের ওপর মার্কিন–ইসরাইলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য নতুন যুদ্ধের দিকে ধাবিত হওয়ায় এই জ্বালানির দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠতে পারে। এনার্জি ও রিফাইনিংয়ের (আইসিআইএস) ডিরেক্টর অজয় পারমার বলেন, যদিও সামরিক হামলা হলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। তবে এখানে প্রধান বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি– সপ্তাহ শেষে প্রতি ব্যারেল দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যাবে এবং যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তবে সেই দামও ছাড়িয়ে যেতে পারে। খবর রয়র্টাসের। প্রখ্যাত জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে পর্যালোচনা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরানের ওপর ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জেরে সোমবার (২ মার্চ) বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অন্তত ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ দাম বাড়ার প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে ঢুকত যা বর্তমানে বন্ধ আছে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেলের নিট ঘাটতি থেকে যাবে। তেলের দাম ২০ ডলার বাড়লে পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বিশ্বজুড়ে হু হু করে বেড়ে যেতে পারে, যা নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে। তাই অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমন করে ফের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে।








