ইরানে মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

যুক্তরাষ্ট্র সহজেই হরমুজ প্রণালি খুলতে পারবে : ট্রাম্প । স্থল অভিযান হলে কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত না ফেরে : ইরানি সেনাপ্রধান । যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সতর্কতা জাতিসংঘের

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান সংঘাত এখন শুধু সামরিক সীমায় আটকে নেই। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও। সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহে একদিকে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক উত্তেজনাও তীব্রতর হয়েছে।

গতকাল দক্ষিণ ইরানে একটি মার্কিন এফ১৫ই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিমানের অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে অপর সদস্য এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটায় উদ্ধার কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়েছে। এদিকে ইরানের কোহগিলুয়েহ ও বোয়েরআহমদ প্রদেশের গভর্নর জানিয়েছেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিধ্বস্ত বিমানের ক্রু সদস্যদের জীবিত আটক করা। এমনকি এ কাজে সফল হলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতির সামরিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী ইরান ও লেবাননে একযোগে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় পশ্চিম ও মধ্য ইরানের ৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ড্রোন ঘাঁটি ছিল প্রধান টার্গেট। একই সময় লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে বক্তব্য দিয়েছেন। নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশালে পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই এই কৌশলগত জলপথ খুলে দিতে সক্ষম এবং তেলের সরবরাহ পুনরায় সচল করতে পারে। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এই পথ নিশ্চিত করা। এই বক্তব্য কেবল সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিতই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাসও দেয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও একইসঙ্গে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে, যা দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করবে।

এদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতামি কমান্ডারদের যেকোনো হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। বিশেষ করে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত ফিরে যেতে না পারে। এই বক্তব্য সংঘাতকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্ব পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের নৌ গোয়েন্দা প্রধান বেহনাম রেজায়ির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এর আগে ইসরায়েল তাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছিল। একইভাবে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে থাকা আরেক কমান্ডারের মৃত্যুও নিশ্চিত হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। গতকাল কুয়েতের মিনা আলআহমাদি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটি একই স্থাপনায় তৃতীয় হামলা। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি শোধন প্ল্যান্টেও হামলা চালানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চলের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতেও ড্রোন প্রতিহত করার সময় একটি গ্যাস কারখানায় আগুন লাগে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য কুয়েতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে পশ্চিমা দেশগুলো ধীরে ধীরে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে বা অন্তত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান জোরদার করছে।

ইরানের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি অস্থির। গতকাল কারাজ শহরে একটি সেতুতে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলা শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে, যা মানবিক সংকটকে তীব্রতর করছে। এছাড়া, ইরানের শাসকরা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমাতে গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে। রাতে সড়কে টহল বাহিনীর শব্দে সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সংঘাতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে যখন দক্ষিণ ইরানে একটি চীনা নির্মিত ‘উইং লুং২’ ড্রোন ভূপাতিত হয়। প্রাথমিকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন বলে দাবি করা হলেও পরে বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। যদি তা সত্য হয়, তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

কূটনৈতিক পর্যায়ে রাশিয়াও সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে তারা সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছে যে, ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে খাদ্যমূল্য সূচক ২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ এই জলপথ বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট, যা বন্ধ বা অস্থিতিশীল হলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে।

সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। সামরিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তাসবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না, ফলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহামের প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব ছুটি বাতিল
পরবর্তী নিবন্ধটাঙ্গাইল থেকেই কৃষক কার্ড বিতরণ