ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে ইরান কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভ দমনাভিযানে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি স্বীকার করল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীরা দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কয়জন সাধারণ নাগরিক আর কয়জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে ভেঙে কিছু বলেননি তিনি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইরানে বিক্ষোভ দমনাভিযানের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেত্তে কুপার সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচিকে।
অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের কয়েকটি বাজারে ছোট ছোট বিক্ষোভ থেকে ইরানে বিক্ষোভের শুরু। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে। মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন সব মিলিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে থাকে লাগাতার। গত বৃহস্পতিবার থেকে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। ইরানের নির্বাসিত শেষ শাহ’র ছেলে রেজা পাহলভির সরকারের বিরুদ্ধে আরো জোরালো প্রতিবাদের ডাকের পরই রাস্তা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
বিক্ষোভ চালিয়ে যান, সাহায্য আসছে : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তাদেরকে রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাহায্য আসছে বলে তাদেরকে আশ্বস্তও করেছেন তিনি।
গতকাল নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন। হত্যাকারী ও নিপীড়কদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে। কাণ্ডজ্ঞানহীন এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সবরকম বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য পৌঁছানোর পথে রয়েছে। তবে এই ‘সহায়তা’ ঠিক কী ধরনের এবং কখন সেটি ইরানে যাবে সে বিষয়ে তিনি খোলাসা করে কিছু বলেননি।
এখনো হামলার কথা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন : ইরানের সরকার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ক্রমবর্ধমান চাপে থাকা অবস্থায় দেশটিতে আঘাত হানার বাস্তবতা বিবেচনা করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তারা জানিয়েছে, বিবেচনা করা অনেকগুলো বিকল্পের মধ্যে বিমান হামলা অন্যতম। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে সামরিক হামলার হুমকি দেওয়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আঘাত হানার প্রস্তুতিও নিয়ে চলেছে, জানিয়েছে আল জাজিরা।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটরি ক্যারোলাইন লেভিট সোমবার বলেছেন, কূটনীতি সবসময়ই প্রথম বিকল্প, কিন্তু সামরিক হামলার পরিকল্পনা বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যে বিষয়টিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুবই ভালো তা হলো তিনি সবসময় সব বিকল্প সামনে রাখেন। আর বিমান হামলা এগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে। কমান্ডার ইন চিফের (ট্রাম্প) জন্য টেবিলে অনেকগুলো বিকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫% শুল্ক চাপালেন ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ টানা তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে।
ইরানের সঙ্গে ‘বাণিজ্য করা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, এ শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। এর পরেই রয়েছে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও ভারত। তেহরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর পরই বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেন তিনি।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সোমবার বলেন, বিমান হামলাসহ সামরিক বিকল্পগুলো এখনো বিবেচনায় রয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিবিসিসহ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরানের ভেতর থেকে প্রতিবেদন করতে পারছে না।












