ইরানের হামলায় সৌদিতে মার্কিন বিমান ধ্বংস

ইসরায়েলের শিল্প এলাকায় আগুন, বিপজ্জনক রাসায়নিক ছড়ানোর আশঙ্কা । আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের মাটিতে নামার অপেক্ষা করছি : ইরান । এই যুদ্ধ ভোগাতে পারে ৮০০ কোটি মানুষকে

আজাদী ডেস্ক | সোমবার , ৩০ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে একটি বিধ্বস্ত মার্কিন এডব্লিউএসিএস বিমানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যার সত্যতা বিবিসি নিশ্চিত করেছে। দুই দিন আগেই এই ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। পরবর্তীতে তারা এই বিশেষ বিমান এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস করার ঘোষণা দেয়। ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোতে বিধ্বস্ত বিমানটির নম্বর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

বিবিসি জানায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৬টি সচল ‘বোয়িং এ৩ সেন্ট্রি’ বা এডব্লিউএসিএস বিমান রয়েছে, যা এই হামলার ফলে কমে ১৫টি হবে। বিমানটির ফ্লাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হামলার আগে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে অন্তত ছয়টি এডব্লিউএসিএস বিমান মোতায়েন ছিল। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

এদিকে ইসরায়েলের দক্ষিণে নেগেভ মরুভূমিতে একটি শিল্প এলাকায় ইরানের হামলার পর আগুন লেগেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের গণমাধ্যম। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বীরশেবা শহরের দক্ষিণে অবস্থিত নে’ওত হোভাব শিল্প কমপ্লেঙ থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উড়ছে। ইরানের ছোড়া ক্ষেফণাস্ত্রের শার্পনেলের আঘাতে এই আগুন ধরে গিয়ে থাকতে পারে, বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ। এর আগে আইডিএফ ঘোষণা করেছিল, তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের জন্য কাজ করছে। হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও শিল্পাঞ্চলে লাগা আগুনের ধোঁয়া থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ফলে কাছাকাছি এলাকার বাসিন্দাদের এবং শিল্পকেন্দ্রের কর্মীদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় দমকল ও উদ্ধারকারী কর্তপক্ষ। আগুন ছড়িয়ে পড়া অঞ্চলে ‘হ্যাজারডাজ ম্যাটেরিয়ালস ইন্সিডেন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মীদেরকে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়েছে। ইসরায়েলভিত্তিক বৈশ্বিক ফসল সুরক্ষা কোম্পানি আদামা এক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের মাখতেশিম এলাকার প্ল্যান্টটিতে হামলা হয়েছে। হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ওই স্থলে আঘাত হেনেছে কিংবা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে ধ্বংসাবশেষ সেখনে পড়েছে। এতে প্ল্যান্টটির কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি বলে জানিয়েছে আদামা।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের মাটিতে নামার অপেক্ষা করছি : ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ বলেছেন, তার দেশের বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের মাটিতে নামার জন্য অপেক্ষা করছে, যাতে তাদের ওপর গুলির বৃষ্টি বইয়ে দেওয়া যায়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার সেনা ইউএসএস ত্রিপোলি রণতরীতে করে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের স্পিকার একথা বললেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদক্ষেপ অনুমোদন করবেন কিনা সেটি স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে ‘দ্য ওয়াশিয়টন পোস্ট’ পত্রিকা। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। কিন্তু তারপরই তিনি বলেন, যদি পাঠাইও, সেটি আমি আপনাদেরকে বলব না। আবার গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনও স্থলসেনা ছাড়াই ইরানে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সামপ্রতিক সেনা মোতায়েনের মানে ট্রাম্পের হাতে বিকল্প রাখা বলে জানান তিনি। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খার্ক দ্বীপ দখল করা যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হরমুজ প্রণালির কাছের এলাকায় নজরদারিও শুরু করেছে মার্কিন সেনারা। ফলে সেই জল্পনা আরও বাড়ছে।

এই জল্পনা বাড়তেই ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেযুক্তরাষ্ট্র যদি কোনও রকম স্থলঅভিযানের করার চেষ্টা করে, তা হলে অকল্পনীয় হামলার মুখে পড়তে হবে। এরপরই ইরান জানাল, মার্কিন সেনাদের জন্য তারা অপেক্ষা করছে।

ইরান যুদ্ধ ভোগাতে পারে ৮০০ কোটি মানুষকেই : ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে তা বিস্তৃত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যার খেসারত পুরো পৃথিবীকে দিতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন। গত শনিবার ইস্তাম্বুলে ‘স্ট্র্যাটকম সামিটে’ তিনি এই শঙ্কার কথা শোনান বলে আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে। তুরস্কের ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের’ প্রধান কারিন মনে করেন, কোভিড মহামারীর পর থেকে বিশ্ব নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, সংকট ও ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পাঁচ বছরে গড়ানো রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা এখনও অস্পষ্ট। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখনো ভোগাচ্ছে। গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও আইন লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। কালিন মনে করেন, বর্তমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় গত বছরের জুনে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিন যুদ্ধ চলে ইরানের। এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে নতুন করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তিনি বলেন, বর্তমানে এক মাস ধরে যে যুদ্ধ চলছে, আমরা তারা মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছি। তার দাবি, ইরানে হামলা ঠেকাতে এবং যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া রোধে তুরস্ক জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তার মতোই ইসরায়েলের শুরু করা আঞ্চলিক যুদ্ধ দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। এটি এমন এক যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, যার মূল্য ৮০০ পৃথিবীর কোটি মানুষকেই দিতে হবে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা হচ্ছে এই যুদ্ধ যেন যত দ্রুত সম্ভব শেষ হয়।

চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিভাজন আরও গভীর করে তুলতে পারে মন্তব্য করে কালিন বলেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নির্মূল করা নয়, বরং তুর্কি, কুর্দি, আরব ও পারস্য অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করা। তুরস্ক এমন বিভাজনে কখনো ভূমিকা রাখবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, তুরস্ক কখনও বিভেদের আগুনে ঘি ঢালার পক্ষে ছিল না এবং কখনও থাকবেও না।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ নয় বলে মনে করেন তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান। মধ্যপ্রাচ্যে ‘জোর করে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা চলছে’ বলেও দাবি করেন তিনি। ‘আমরা খুব ভালো করেই জানি, যারা এই যুদ্ধ বাধিয়েছে, তারা ধ্বংস ও দখলদারিত্বের নীতির মাধ্যমে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং অন্যান্য স্থানে নতুন বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করছে।’

কালিনের অভিযোগ, ইসরায়েল সংলাপের পথ খোলার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে। যুদ্ধের আগের মতোই আমরা দেখছি, আলোচনা ও যোগাযোগের পথ নস্যাৎ করতে ইসরায়েল জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে হাজার দেড়েক মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন। এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান। জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসরকারি কর্মচারীদের ৪০ মিনিট অফিস কক্ষে আবশ্যিকভাবে অবস্থানে জনপ্রশাসনের নির্দেশনা
পরবর্তী নিবন্ধখাগড়াছড়িতে বজ্রপাতে এক জনের মৃত্যু