ইবি শিক্ষক রুনা হত্যার বিষয়ে যা জানা গেল

| শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

অতীতের কিছু ঘটনা, অফিস সহায়কের বদলি, একজন শিক্ষকের বিভাগীয় প্রধান হওয়ার দুরভিসন্ধির পরিপ্রক্ষিতে বিভাগের তিন সহকর্মীর সরাসরি প্ররোচনা ও নির্দেশনায় একজন কর্মচারী কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

তিন সহকর্মীর দুজন শিক্ষক; তারা হলেনবিভাগের সাবেক প্রধান সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। অপরজন বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার এবং বর্তমানে উম্মুল মোমেনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস। আর কর্মচারী হলেন খন্দকার ফজলুর রহমান। তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক মাস্টার রোলের কর্মচারী। ২০১৮ সাল থেকে তিনি সেখানে কাজ করছেন। সমপ্রতি তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বদলি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি ফজলু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের শান্তিডাঙ্গা গ্রামের হামিদুর রহমানের ছেলে। খবর বিডিনিউজের।

বুধবার বিকালে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনাকে তার কক্ষে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমানকেও গলায় ক্ষতসহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ, প্রশাসন দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নারী শিক্ষককে মৃত ঘোষণা করেন। প্রধান আসামি ফজলু কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি মাসুদ রানা বলেন, বৃহস্পতিবার শিক্ষিকা রুনাকে দাফনের পর পর তার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ এরই মধ্যে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আসমা সাদিয়া রুনা দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরের আশিকুল হক রুহুলের মেয়ে। তার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন শিক্ষক। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তারা কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া এলাকার মীর মশাররফ হোসেন সড়কে থাকেন।

রুনার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান মামলায় আগের কতগুলো ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রুনা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগের সভাপতি হিসেবে যোগ দেন। তার আগে বিভাগের সভাপতি ছিলেন তিন নম্বর আসামি শ্যাম সুন্দর সরকার। কিন্তু শ্যাম সুন্দর বিভাগের আয়ব্যয়ের হিসাব নতুন সভাপতিকে বুঝিয়ে দেননি। অভিযোগে বলা হয়, তখন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ছিলেন দুই নম্বর বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস। তিনি সভাপতিকে বলেন, ‘যেভাবে সামনে কাগজ ধরব, সেভাবে স্বাক্ষর করবেন’। এসব বিষয়ে শিক্ষক রুনা আশ্চর্য হন এবং বিভাগের টাকার স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচের কথা বলেন।

মামলায় বলা হয়, এখান থেকেই শ্যাম সুন্দর, বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে বিভাগের সভাপতি রুনার মনস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ দুজন কর্মচারী ফজলুর রহমানকে দিয়ে বিভিন্ন সময়ে সভাপতি অসহযোগিতা ও হেনস্তা করেছেন। শিক্ষক হাবিবুরের সামনে ফজলু বিভাগীয় সভাপতিকে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার ও অশালীন আচরণ করেন। কিন্তু হাবিবুর তার কোনো প্রতিবাদ করেননি।

এক পর্যায়ে ফজলুরকে তার আচরণের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। জবাবে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে বিষয়টি সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক রোকসানা মিলিকে মৌখিকভাবে অবহিত করেন সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি।

বিভাগীয় সভায় ডিনের নির্দেশে ফজলুকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমান মানতে পারেননি বলে বাদীর ভাষ্য। এরপর ফজলু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে চলে যান। অপরদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজিৎ সরকারকে প্রশাসন বিভাগ থেকে হলের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলি করা হয়।

মামলায় অভিযোগে বলা হয়েছে, এরপর থেকে বিশ্বজিৎ সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনার সঙ্গে দেখা করেননি। বিভাগীয় সভাপতি তাকে ফোন করে নতুন যে দায়িত্ব নিয়েছেন তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বললেও তিনি আসেননি। মো. হাবিবুর রহমান প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ায় তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার দুরভিসন্ধি দেখতে থাকেন।

এই অবস্থায় তিন আসামির সরাসরি প্ররোচনা ও নির্দেশনায় আসামি ফজলুর রহমান শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনার কক্ষে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে তার গলায় ছুরি মেরে হত্যা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে নাম আসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, এটি সম্পূর্ণ মনগড়া অভিযোগ। তিনিও আসমা সাদিয়া রুনা হত্যার বিচার দাবি করেন।

শুক্রবার বিকালে তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চরমভাবে একটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চর্চা এবং প্রতিকূল অবস্থা চলছে। বলতে পারেন আমি তার শিকার। আমার মত আরও অসংখ্য মানুষ শঙ্কা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে আমি ১৫১৬ দিন আগেই নতুন কর্মস্থলে যোগদান করি। আগের কর্মস্থল থেকে আসার সময় সবকিছু দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি এবং অনাপত্তিপত্রসহ নতুন কর্মস্থলে যোগ দেই। এরপর আমার সঙ্গে ওই বিভাগের কারোর কোনো যোগাযোগ ছিল না।

বিশ্বজিৎ বলেন, এখন শুনছি, হত্যা মামলার এজাহারে আমার নাম দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া এবং উনি (মামলার বাদী) হয়ত প্ররোচিত হয়ে আমার নাম দিয়েছেন। অথচ শিক্ষক হত্যার ঘটনার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। আমিও চাই, শিক্ষক হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

এ বিষয়ে জানতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের মোবাইলে ফোন করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনাকে গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন বিভাগের একটি ইফতারের আয়োজন করা হয়েছিল। সবাই সেটা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। তার মধ্যেই ওই ঘটনা ঘটে।

হাসপাতালে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বুধবার রাতে সাংবাদিকদের বলছিলেন, ফজলুকে কয়েকদিন আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়েছে। ম্যাডাম সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান। বদলির সময় থেকে ফজলুর মনে হয়ত একটু কষ্ট ছিল। এটাকে কেন্দ্র করে আজকে হঠাৎ করে কক্ষে এসে শিক্ষিকাকে একা পেয়ে ছুরিকাঘাত করে।

সেদিন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নিয়ামতুল্লাহ মুনিম বলেছিলেন, ফজলুর রহমান দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারী। প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, ম্যাডামের সঙ্গে তার পেমেন্টসহ কিছু বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডার পরিপ্রেক্ষিতেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি।

হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের সদস্যরা চাকরি নিয়ে ফজলুর ক্ষোভ ও হতাশার কথা বললেও এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। ফজলুর রহমানের চাচা সদর উপজেলার শাস্তিডাঙ্গা ১৪ মাইল পাড়া গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার লুৎফর রহমান বৃহস্পতিবার বলছিলেন, এসব বিষয়ে ওর (ফজলুর) হয়রানি ছিল এটা ঠিক। কিন্তু সেটা যে একজন শিক্ষককে হত্যা পর্যন্ত গড়াবে এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমিও চাই, প্রকৃত দোষীর বিচার হোক। সেখানে যদি আমার ছেলেও দোষী হয় তবু বিচার চাই। ফজলুকে সুস্থ করে তোলা হোক, ওর মুখ থেকে প্রকৃত ঘটনা শুনে তদন্ত করা হোক।

চাকরি করতে গিয়ে ফজলু কষ্টের মধ্যে পড়েছিল বলে দাবি করেন চাচা লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ফজলু মাস্টার রোলে (দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কর্মচারী) বেগার খাটছে। মাস শেষে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। এই ত্যাগ করে আসছিল যে, একটা সময় চাকরি স্থায়ী হয়ে গেলে এই কষ্টটা লাঘব হয়ে যাবে। ৫ আগস্টের পর কোনো শূন্য পদ না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কয়েকশ লোকের নতুন করে চাকরি দিয়েছে। অথচ ফজলু যে বেগার খাটছিল সেখানেই পড়ে থাকল। এ ছাড়া ফজলুকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে স্থানান্তর করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দিয়েছিল। সেখানে গিয়ে ফজলু অবস্থান হয়েছিল নতুন হিসেবে। আবার আগের বিভাগে কর্মকালীন প্রায় বছর খানেকের বেতনও বকেয়া ছিল।

ফজলুর মামাতো ভাই সজল সাংবাদিকদের বলেন, জটিলতার কারণে ফজলুর নয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছিল না। পরিবার নিয়ে কার কষ্টে দিন কাটছিল। এই অবস্থার মধ্যে তাকে আবার অন্য বিভাগে বদলি করা হয়। এ থেকে কিছু হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

ফজলুর রহমান তার দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক চাকরিটি স্থায়ী করার জন্য অনেক জায়গায় ধরনা দিয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলমের কাছেও গিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বৃহস্পতিবার বলেন, হ্যাঁ, আমার কাছে ফজলু তার চাকরি স্থায়ী করার বিষয়টি নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাজটা করেও দিয়েছি। সেই সঙ্গে ওর বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনা ওর কাজ করে দিয়েছিল বলেও শুনেছি। অথচ এর অভ্যন্তরে আবার কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তাকে হত্যা করার পথ বেছে নিতে হল।

ফজলুর চাকরি নিয়ে কোনো জটিলতা ছিল না বলেও দাবি করেন ট্রেজারার। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহিনুজ্জামান মোবাইলে বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি একেবারে ফৌজদারি কার্যবিধির বিষয়। ওটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দেখছেন। তবে এমন প্রাণঘাতী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ক্যাম্পাসের মধ্যে কোনো প্রেক্ষাপটে ঘটলে সেটা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয় একটা তদন্ত কমিটি করবেন। সেই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ক্যাম্পাসে এ জাতীয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুনরায় যাতে না ঘটে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি তখন শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনার জানাজায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন। পরে তার মোবাইলে ফোন করলে তিনি ধরেননি। এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচাতরি চৌমুহনী বাজারে অবৈধ স্থাপনা, গাড়ির স্ট্যান্ড
পরবর্তী নিবন্ধদ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : প্রধানমন্ত্রী