ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে

অধ্যাপক সরওয়ার জাহান | বৃহস্পতিবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে এই দিবসটি পালন করা হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো এবং বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হতে উৎসাহিত করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। এটি অনলাইন নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদযাপন। এই দিবসটিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বশীল ব্যবহার, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। তাছাড়া সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় ।

২০০৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেইফবর্ডার প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই দিবসটির যাত্রা শুরু হয়। পরের বছর থেকে ইনসেইফ নেটওয়ার্ক দিবসটি উদযাপনের দায়িত্ব নেয়। প্রাথমিক ভাবে নিজস্ব অঞ্চলের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেও নিরাপদ ইন্টারনেট দিবসে সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম চলে । সাইবার নিরাপত্তায় যেকোনো প্রয়োজনে ৩৩৩, ১০৪ বা ১৩২১৯ হেল্পলাইন নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করা যায়। ইন্টারনেটকে সবার জন্য আরও নিরাপদ, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং তথ্যপূর্ণ করে তোলাই এই দিবসের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: স্মার্ট প্রযুক্তি, সঠিক সিদ্ধান্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AIএর ব্যাপক প্রসারের কথা মাথায় রেখে এ বছর কীভাবে AIকে নিরাপদ উপায়ে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা যায়, সেই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

দিবসটির মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি () সাইবার বুলিং, সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং এবং ফিশিং লিঙ্কের মতো ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সবাইকে সচেতন করা। () AI ও নতুন প্রযুক্তি: চ্যাটবট বা এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা। () অভিভাবকদের ভূমিকা: শিশুরা ইন্টারনেটে কী দেখছে বা কাদের সাথে কথা বলছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের গাইডলাইন প্রদান। () ডিজিটাল জ্ঞান : ইন্টারনেটে ছড়ানো গুজব বা ফেক নিউজচেনার দক্ষতা তৈরি করা।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই দিবসটির আলোচনা থাকলেও গুরুত্বের সাথে পালিত হয় না। এমনকি দেশে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা শীর্ষ ব্যক্তিরাও এ সম্পর্কে কোনও ধারণাই রাখেন না। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি এবং বিভিন্ন আইসিটি সংস্থা এই দিনে সেমিনার, কর্মশালা এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে। ২০২৬ সাল থেকে গুগল ক্রোমের মতো ব্রাউজারগুলোতে অনিরাপদ সাইটে প্রবেশের আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার ফিচারটি আরও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিরাপদ ইন্টারনেট গড়ার পথে বড় একটি পদক্ষেপ।

বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের পরিসর ক্রমশ বাড়ছে। এই তালিকায় বাংলাদেশেও যথেষ্ট পরিমাণ এগিয়ে রয়েছে। বিটিআরসি (BTRC) এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ৮ লাখের বেশি (মে ২০২৫ )। তবে, কোনো কোনো গবেষণায় এই সংখ্যাটি প্রায় ৭ কোটি ৭৭ লাখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জনসংখ্যার তুলনায় ১৫তম অবস্থানে রয়েছে। পারিবারিক ব্যবহারের হার: ৫৬ শতাংশের বেশি পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে (বিবিএসডিসেম্বর ২০২৫)। মোবাইল গ্রাহক: ১৮ কোটি ৬২ লাখের বেশি, তবে এর মধ্যে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ভিন্ন। শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬৮ শতাংশের বেশি হলেও গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৩৮ শতাংশের কম। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, সেখানে নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য এসব কার্যক্রম গুরুত্বের প্রথম সারিতেই থাকা উচিত ছিল বলে মনে করেন আইসিটি বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বৃদ্ধির সমানতালে বাড়ছে ইন্টারনেট অপরাধ। ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ছে, এ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বড় অংশ যুব সমাজ। অপরাধীরা তাদেরকে সাইবার অপরাধে যুক্ত করছে। বর্তমানে বিশ্বের সকল দেশ ইন্টারনেট অপরাধে ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত। এটি অপরাধের তালিকায় শীর্ষে স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ প্রত্যেকটি দেশেই এ অপরাধ ঠেকাতে সাইবার আইন থাকলেও বাস্তবতা কিছুতেই যেন কমানো যাচ্ছে না এ অপরাধ।

পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট অপরাধের কারণে শুধু ইউরোপে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় এক হাজার বিলিয়ন ডলার। প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে এক মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ইন্টারনেট অপরাধের শিকার হন। বাংলাদেশও বিগত পাঁচছয় বছরে ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট অপরাধ বাড়ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী হতে শুরু করে সরকারি ওয়েবসাইট, সাধারণ মানুষ, পর্নোগ্রাফি, মাদক, ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন হতে শুরু করে বিভিন্নভাবে এ অপরাধের বিস্তৃতি ঘটেছে। এখন ভয় সর্বত্র ছড়ানো। অনলাইনে কেনাকাটার ভয়, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যোগ দিতে ভয় এবং ভয় দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেট ব্যবহারেও। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ইন্টারনেট অপরাধ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের দিকে যেতে থাকবে। এ জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রত্যেকটি দেশ। এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রথম। কিন্তু বাংলাদেশে এ সচেতনতা বাড়াতে কোনো পদক্ষেপ বা কর্মসূচী নেই। এ দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে সচেতনতা।

ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সব স্তরের মানুষকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। ইন্টারনেটের কারণে গোটা পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। সব চাওয়ারই পূর্ণতা মেলে এখানে। তাই ভালো এবং শিক্ষণীয় বিষয় গ্রহণ করতে হবে আর মন্দ জিনিস থেকে বিরত থাকতে হবে। তা না কাঙ্ক্ষিত দুর্নীতিমুক্ত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভবপর হবে না। ইন্টারনেট ব্যবহার ছাড়া বর্তমান সময়ে এগুনো প্রায় অসম্ভব। দেশ গঠনে তরুণযুবাদের সমৃদ্ধ হয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে।

সাইবার প্রযুক্তির ঝুঁকি ও সম্ভাবনাগুলো বিবেচনা করার এবং ঝুঁকিগুলো কমিয়ে আনতে আমাদের সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও শক্তি ব্যবহারের সময় এসেছে। ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না, কারণ এটি একইসঙ্গে বিশাল জ্ঞান ও তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে, যা আজকের এই বিশ্বে সকলের প্রয়োজন। ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।

ইন্টারনেট আমাদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও, অসতর্কতায় আমরা পড়তে পারি সাইবার ঝুঁকির মুখে। তাই নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখতে সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান নেটসংযুক্ত বিশ্বে এদেশের শিশু ও কিশোরকিশোরীরা অনলাইনে ঝুঁকি ও বিপদের মুখোমুখি হয়। ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার জন্য টুফ্যাক্টর অথেনটিকেশন সোশ্যাল মিডিয়া ও ইমেইল অ্যাকাউন্টে চালু রাখা আত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি নিরাপত্তা প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যবহারকারীকে লগইনের সময় দুটি ভিন্ন ধরনের তথ্য বা ধাপের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। এটি পাসওয়ার্ড চুরি হলেও হ্যাকারদের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করে, যা প্রায় স্বয়ংক্রিয় সাইবার অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে সক্ষম এবং এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করে শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। অপরিচিত লিঙ্ক ইমেইল বা ইনবক্সে আসা সন্দেহজনক কোনো লিঙ্কে দেখা মাত্রই ক্লিক না করা, যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা। নয়তো ভুল করে ক্ষতিকর কোথাও ক্লিক করে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছুদিন পরপর অপারেটিং সিস্টেম, ব্রাউজার কিংবা অন্যান্য সফটওয়্যার আপডেট রাখা। সবসময় নিরাপদ থাকতে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করা। যদিও সব ধরনের নিরাপত্তা অ্যান্টিভাইরাস দিতে সক্ষম নয়। তারপরও ৯০ শতাংশ হুমকি মোকাবেলার সক্ষমতা এর রয়েছে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও টেকসই উন্নয়ন কর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহিংসা-প্রতিহিংসায় রূপ নেয়: রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ে
পরবর্তী নিবন্ধড. মঈনুল ইসলামের কলাম