ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়। ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, চেতনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা। যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, কিংবা জেনে–বুঝে তাকে বিকৃত হতে দেয়, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের শেকড় হারায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের সমাজে ইতিহাস বিকৃতির এক নীরব কিন্তু গভীর সংকট চলমান।
ইতিহাস বিকৃতি কখনো হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, কখনো অজ্ঞতার কারণে। ক্ষমতার পালাবদলে, রাজনৈতিক স্বার্থে কিংবা সংকীর্ণ মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ইতিহাসের সত্য অধ্যায়গুলোকে আড়াল করা হয়, বিকৃত ভাষ্যে উপস্থাপন করা হয়, এমনকি সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা হয়। এতে করে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়।
একটি জাতির মহান অর্জন, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস যদি বিকৃত করা হয়, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুপ্রেরণা হারায়। তারা জানতেই পারে না যে কীভাবে এই দেশ গড়ে উঠেছে, কারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, কোন আদর্শ আমাদের পথ দেখিয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি মানে কেবল অতীতকে আঘাত করা নয়, এটি বর্তমানকে বিভ্রান্ত করা এবং ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।
বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিহাস উপস্থাপনার ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যাচাইহীন তথ্য, খণ্ডিত সত্য কিংবা উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে। ইতিহাস তখন আর শিক্ষার আলো হয়ে ওঠে না, বরং বিভ্রান্তির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। গবেষণালব্ধ সত্য, নির্ভরযোগ্য দলিল ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাস চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিক সহ সবারই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, ইতিহাসকে ভালোবাসা। সত্য ইতিহাসকে জানার আগ্রহ, বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরার দৃঢ়তা। মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সত্যের সঙ্গে আপস চলতে পারে না।
আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে ইতিহাস বিকৃতিকে না বলি। সত্য ইতিহাসের পক্ষে বলি ‘হ্যাঁ’ । কারণ ইতিহাস বাঁচলে, জাতি সঠিক পথে হাঁটবে। এটাই হোক সর্বস্তরের প্রত্যাশা।












