ইতিকাফ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক মহিমান্বিত ইবাদত

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ১৩ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ইতিকাফ মাহে রমজানের অন্যতম একটি গুরুত্ব্বপূর্ণ ইবাদত। মাহে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ইতিকাফ করতেন। সাহাবায়ে কেরামও ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফের মাধ্যমে মুসলমানগণ আল্লাহর জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে শবে কদর তালাশ করেন। সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করে থাকেন। রমজান মাসের পরেই শুরু হয় হজের মওসুম। ইতিকাফের মাধ্যমে বায়তুল্লাহর হজের প্রস্তুতি শুরু করে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা। অতএব ইতিকাফ আল্লাহপ্রেম ও আখেরাতমুখিতার উজ্জ্বল নমুনা। রমজানের শেষ দশকের একটি আমল হলো ইতিকাফ করা। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে আল্লাহতাআলার নৈকট্য লাভ করার জন্য সুসম্পর্ক স্থাপন করা। ইতিকাফের একটি বড় ফায়দা হলো ইতিকাফ কারী অত্যন্ত পবিত্র ও গুনাহমুক্ত পরিবেশে থাকেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে মসজিদে তাঁর অবস্থানটুকুই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। রমজানের রহমত, বরকত ও তাকওয়া অর্জনের চূড়ান্ত অনুশীলনের অনন্য মাধ্যম হচ্ছে ইতিকাফ।

ইতিকাফ ৩ প্রকার। যথা. ওয়াজিব ২. সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ৩. নফল ইতিকাফ।

. ওয়াজিব ইতিকাফ : কোনো কারণবশত যদি কেউ ইতিকাফের নিয়ত বা মান্নত করে তা আদায় করা ওয়াজিব। রোজাসহ এইরূপ ইতিকাফ আদায় বা পালন করা আবশ্যক। ২. সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ইতিকাফ : যা মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন করা হয়। মসজিদ এলাকার কিছুসংখ্যক লোক ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকেই আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু কেউই যদি আদায় না করে তবে সবাই গুনাহগার হবে। হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুল সা. সবসময় রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। ৩. নফল ইতিকাফ : নফল ইতিকাফের জন্য কোনো মাস বা নির্ধারিত সময়ের প্রয়োজন হয় না। যে কোনো মাসে যে কোনো সময়ে এই নফল ইতিকাফ করা যায়। মাহে রমজানের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ আত্মিক উৎকর্ষ সাধন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। লাইলাতুল কদরের পূর্ণ ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা হয়। এ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে রাসুল (সা.) মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করেছেন।

ইতিকাফের তাৎপর্য হলো সৃষ্টজীব থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে নিজকে আবদ্ধ করে নেয়া। আর আল্লাহ সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান যত বাড়বে আল্লাহর মহব্বত হৃদয়ে যত পোক্ত হবে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে যতটুকু অগ্রসর হবে দুনিয়ার প্রতি প্রেম ভালোবাসা ততই অন্তর্নিহিত হবে। ইতিকাফ হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে পালিত জিবরঈল আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। জিবরাঈল (.) প্রতি রমজানেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন শুনাতেন এবং নিজেও তাঁর থেকে শুনতেন। আর যে বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াফাত হয় সে বছর তিনি দুবার কুরআন শুনান এবং শোনেন। ইবনে আব্বাস (রা.) এর বর্ণনায় বুখারিতে আরো এসেছে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক দানকারী ছিলেন তবে তিনি সবচে বেশি দান করতেন যখন জিবরাঈল (.) তাঁকে কুরআন শুনাতেন। আর জিবরাঈল (.) রমজানের প্রতি রাতেই তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁকে কুরআন শেখাতেন।

ইতিকাফের ফজিলত রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোর যেকোনো একটিতে শবে কদর রয়েছে। আর শবে কদরের ইবাদত তিরাশি বছর চার মাস ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শবে কদর প্রাপ্তির আশা নিয়েই ইতিকাফ করতেন। তিনি প্রথম দশকেও ইতিকাফ করেছেন মধ্য দশকেও করেছেন এরপর শেষ দশকে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন আমি প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছি এরপর মধ্য দশকে এরপর আমাকে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে তা শেষ দশকে। অতএব তোমাদের মধ্যে যার ইতিকাফ করা পছন্দ হয় সে যেন ইতিকাফ করে। রাসুলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করা কখনো বাদ দেননি। তিনি প্রতি বছর দশ দিন ইতিকাফ করতেন। আর যে বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়াফাত ফরমান সে বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেন। উপরন্তু যখন তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করতে প্রতিযোগিতা শুরু করলেন তিনি ইতিকাফ করা ছেড়ে দিলেন এবং তা শাওয়ালের প্রথম দশকে কাজা করে নিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণও ইতিকাফ করতেন। এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াফাতের পরও তাঁরা ইতিকাফ করেছেন।

ইতিকাফের কিছু আহকাম ও মাসাইল:

. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের অনুসরণ করে ইতিকাফের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করা।

. নিয়ত করে ইতিকাফ শুরু করে দেয়ার পর ইতিকাফ পূর্ণ করা জরুরি।

. কমপক্ষে কত দিন ইতিকাফ করলে ইতিকাফ হিসেবে ধরা হব বিষয়টি অনির্দিষ্ট। তবে ইতিকাফকারী যেদিন থেকে ইতিকাফ শুরু করতে ইচ্ছুক সেদিন সূর্যাস্তের পূর্বেই তাকে নিজ ইতিকাফের জায়গায় পৌঁছে যেতে হবে।

. নিজের জন্য একটা জায়গা বেছে নেয়া জরুরি যেখানে নীরবে আল্লাহর জিকিরআজকার করতে পারবে। প্রয়োজনের সময় আরাম করতে পরবে। কাপড় পরিবর্তন করতে পারবে। পরিবারের কেউ এলে তার সাথে সাক্ষৎ করতে পারবে।

. ইতিকাফকারী মসজিদের বিভিন্ন প্রান্তে নফল নামাজ আদায় করতে পারবে। তবে ইতিকাফকারীর জন্য উত্তম হলো অধিক নড়াচড়া ও নফল নামাজ না পড়া। এর প্রথম কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজকে লুকিয়ে রাখা যায় মসজিদের অভ্যন্তরে এমন একটি জায়গা তৈরি করে নিতেন। আর দ্বিতীয় কারণ যখন কেউ নামাজ পড়ার জায়গায় বসে থাকে তখন ফেরেশতারা তার প্রতি রহমত বর্ষণের দুআ করতে থাকে।

. ইতিকাফ অবস্থায় স্বামীস্ত্রী মিলিত হওয়া চুম্বনস্পর্শ নিষেধ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না।

ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া না হওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে হবে :

এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাব, পানাহার। অনুরূপভাবে যে মসজিদে ইতিকাফ করা হচ্ছে তাতে যদি জুমার নামাজ না হয় তাহলে জুমা আদায়ের জন্য অন্য মসজিদে যাওয়ার অনুমতি আছে।

দুই. এমন সব নেকআমল বা ইবাদতবন্দেগির জন্য বের হওয়া যাবে না যা ইতিকাফকারীর জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা জানাজায় অংশ নেয়া ইত্যাদি। তবে যদি ইতিকাফের শুরুতে এ জাতীয় কোনো শর্ত করে নেয়া হয় তবে তার কথা ভিন্ন।

তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না যা ইতিকাফ বিরোধী। যেমন ক্রয়বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। ইতিকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে। সওয়াবের দিক থেকে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম। এরপর মসজিদে নববী, তারপর মসজিদে আকসা। এরপর যে কোনো জামে মসজিদ ও পাঞ্জেগানা মসজিদ। তবে নারীদের জন্য ইতিকাফের স্থান হলো ঘরের নির্দিষ্ট কোনো পবিত্র জায়গা। আমরা যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চাই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাই লাইলাতুল কদরের সুমহান মর্যাদা লাভ করতে চাই সর্বোপরি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে চাই তাদের জন্য উচিত হলো রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। হে আল্লাহ! তোমার করুণাধারায় আমাদের সিক্ত করো। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।.

পূর্ববর্তী নিবন্ধউপহার হিসেবে উত্তম বস্তু হলো বই
পরবর্তী নিবন্ধজুম্’আর খুতবা