দিনের আলো আর রাতের আঁধার–কোনো বাধাই মানছে না মীরসরাইয়ের মাটিখেকো চক্র। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেদারসে কাটা হচ্ছে পাহাড়ের টিলা ও ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল)। ভেকু দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা এই মাটি ট্রাক ও ডাম্পার ভরে সরাসরি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। উর্বরতা হারিয়ে একদিকে যেমন কৃষি জমি মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে কিংবা ভোরবেলায় মাটি কাটার কাজ বেশি হয়। ভেকু মেশিন দিয়ে দ্রুত মাটি কেটে ট্রাকে তুলে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেই এই কাজ করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, আগে এই জমিতে ধান, সবজি সবই হতো। এখন মাটি কেটে নেওয়ার পর জমি নিচু হয়ে গেছে। বর্ষায় পানি জমে থাকে, চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে গেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের সুফিয়া এলাকা, মঘাদিয়া, করেরহাট, জোরারগঞ্জ, মিঠানালা, হিঙ্গুলী, ওয়াহেদপুর, মিঠানালা, ইছাখালী, সাহেরখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে কৃষিজমি কেটে পুকুর খনন বা মাটি বিক্রির ঘটনা ঘটছে। অনেক জায়গায় আবাদি জমি গভীর করে খনন করে পুকুর বানানো হচ্ছে। এসব পুকুর খননের সময় যে বিপুল পরিমাণ মাটি ওঠে, তা ট্রাকে করে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই মাটি ইটভাটা কিংবা বিভিন্ন পুকুর, দিঘি ও নিচু জমি ভরাটের কাজে ব্যবহার করা হয়। উপজেলায় ডজন খানেক ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় বিপুল পরিমাণ মাটির প্রয়োজন হয়। ফলে কৃষিজমির ওপরের উর্বর মাটিই হয়ে উঠেছে সহজ কাঁচামাল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, জমির ওপরের ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি মাটিই সবচেয়ে উর্বর। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কৃষিজমির মাটি কাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। অভিযানে জরিমানা আদায়সহ মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত ভেকু মেশিন জব্দ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শেষ হলে কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও পরে আবার আগের মতোই মাটি কাটা শুরু হয়।
এদিকে মীরসরাইয়ে কৃষিজমি ও পাহাড় কেটে মাটি নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নুরুল আমিন। তিনি বলেন, মীরসরাইয়ের কৃষিজমি ও পাহাড় আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। কোনোভাবেই এগুলো নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। অবৈধভাবে মাটি কাটার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নুরুল আমিন এমপি বলেন, কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই পরিবেশ ও কৃষি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। তিনি সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে মাটি কাটার বিষয়ে মাটি ব্যবস্থাপনা আইন–২০১০ এ অনুমতি ছাড়া কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাহাড় বা টিলা কাটতে হলে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হবে। এছাড়াও ইটভাটায় কৃষিজমির টপসয়েল ব্যবহার করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদের বলেন, আমরা মাটি কাটার খবর পেলেই অভিযান পরিচালনা করছি। গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের আজিজনগর গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। ঘটনাস্থলে কাউকে না পাওয়ায় আটক করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বৃহস্পতিবার আমি ২ স্থানে অভিযান পরিচালনা করেছি, কিন্তু ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতেই দেখি এঙকেভেটর ও ট্রাক উধাও। তবে মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছি।
তিনি আরো বলেন, অবৈধভাবে কৃষিজমি বা পাহাড়ের মাটি কাটার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব সহকারে দেখছে। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় নেই।










