দেশের পোশাকশিল্পকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। কেননা ৪ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন–জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। সামপ্রতিককালে এই খাত, তীব্র অস্থিরতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় আয়ের খাত পোশাকশিল্প বড় মন্দায় পড়েছে। টানা পাঁচ মাস ধরে এ খাতে রপ্তানি কমেছে। এ ছাড়া পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসহ ২৬টি দেশে আগের অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরের প্রথমার্ধের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এমন চিত্র দেখা যায়।
ইপিবির তথ্য অনুসারে ক্রোয়েশিয়ায় আগের অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরের প্রথমার্ধের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। রপ্তানি ৩৪ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ মিলিয়নে। চেক প্রজাতন্ত্রে আগের অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরের প্রথমার্ধের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ২৩ শতাংশ। রপ্তানি ১৬৫ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬২ মিলিয়নে। ডেনমার্কে আগের অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বরের প্রথমার্ধের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। রপ্তানি ৫৫৭ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯৮ মিলিয়নে। ফিনল্যান্ডে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। রপ্তানি ১৬ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২২ মিলিয়নে। ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। রপ্তানি ১৬ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২২ মিলিয়নে। জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। রপ্তানি ২ হাজার ৪৬৯ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৭ মিলিয়নে। হাঙ্গেরিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। রপ্তানি ৮৯ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭ মিলিয়নে। ইতালিতে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। রপ্তানি ৭৭২ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ মিলিয়নে। আয়ারল্যান্ডে রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। রপ্তানি ১২৫ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১১৩ মিলিয়নে। লুক্সেমবার্গে রপ্তানি কমেছে ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। রপ্তানি ২ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯১ মিলিয়নে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যানের চিত্রটি উদ্বেগজনক। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামপ্রতিক সময়ে সার্বিকভাবে রপ্তানি খাতে মন্দা চলছে। দেশের সবচেয়ে বড় আয়ের ক্ষেত্র পোশাকশিল্প পড়েছে কঠিন সংকটে। প্রায় অর্ধ বছরজুড়ে টানা এ খাতের রপ্তানি কমেছে। পোশাক পণ্যের বৃহৎ ভোক্তা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ২৬ দেশে রপ্তানিতে ধস। মোদ্দা কথা পোশাকশিল্পে চলছে হতাশাজনক মন্দা। মোটাদাগে এর প্রধান কারণ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস; যা বিভিন্ন দেশেই রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় কমেছে। এ শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। যেমন বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বিভাজন সরবরাহ চেইন ও ভোক্তা আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; আছে অর্থনৈতিক চাপ: ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তারা পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমাচ্ছেন। এছাড়া আছে অর্ডার রি–শাফলিং: ক্রেতারা কম দামে, কম ঝুঁকির উৎস খুঁজছেন; ভিয়েতনাম, ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সর্বোপরি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানি, কাঁচামাল ও লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ কঠিন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে চাহিদা বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি খাতের জন্য সরবরাহ চেইন, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।








