মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মজুরি বাড়ার হার এখনো কম। যে কারণে ভোক্তার আয়ের চেয়ে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে অর্থের ক্ষয় বেশি হচ্ছে। ফলে ভোক্তারা আর্থিকভাবে চাপে রয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। এতে আরো বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। কিন্তু মজুরির হার বেড়েছে সামান্য। তবে এখনো মূল্যস্ফীতির হার বেশি, মজুরির হার কম। এদিকে মূল্যস্ফীতির হার কমার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলেছেন, মার্চে রোজা ও ঈদের কারণে মানুষের খরচ বেড়েছে, পণ্যের দাম বেড়েছে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার কথা। কিন্তু সরকারি হিসাবে এ হার কমেছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে (বিবিএস) জানিয়েছে।
বিবিএসের হিসাবে গত ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট (গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি) হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত মার্চে একই হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত খাতে এ হার ৯ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরেও এ হার কমেছে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও নির্বাচনের কারণে টাকার প্রবাহ বাড়ায় জানুয়ারির তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চে রোজা ও ঈদের কারণে মানুষ যেমন টাকা খরচ কেরেছে, তেমনি ব্যাংক থেকেও টাকা বের হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে। পণ্যের দামও বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণেও অনেক পণ্যের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি ডলারের দামও বেড়েছে। এসবের প্রভাবে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার কথা। আগে থেকে অর্থনীতিবিদরা এমন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু গত রোবাবর বিবিএস গত মার্চের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে তা কমেছে। গড় মূল্যস্ফীতির হার কমার পাশাপাশি খাদ্য খাতেও এ হার কমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে এ হার বেড়েছে। ঈদের কারণে মানুষ কাপড়, জুতাসহ অন্যান্য উপকরণ কেনাকাটা করায় এ খাতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ হয়েছে।
সমপ্রতি প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৮০ শতাংশ পরিবার সংসার চালানোর খরচ জোগাড় করতে পারে না। প্রতি মাসে এসব পরিবার যত টাকা আয় করে, এর চেয়ে কম আয় করেন এসব পরিবারের সদস্যরা।
পিপিআরসির গবেষণা অনুসারে, সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের প্রতি মাসের গড় আয় ১৪ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। কিন্তু মাসে তার খরচ ১৭ হাজার ৩৮৭ টাকা। এ ছাড়া মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসে গড় আয় ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা। কিন্তু সংসার চালাতে এসব পরিবারের খরচ করতে হয় ২৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মানে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার নিজের প্রয়োজন অনুসারে আয় করতে পারছে না। তাদের ধারদেনা করে চলতে হয়। পিপিআরসি বলছে, ৫২ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছে। সংসার চালানোর খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি পরিবার ঋণ নিয়েছে। এক–তৃতীয়াংশ পরিবার শুধু সংসার চালাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়।
নিম্নআয়ের মানুষ বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত। সংসার চালাতে পারছেন না। খাদ্যপণ্য কিনতেই আয়ের সব টাকা চলে যাচ্ছে। অন্য মৌলিক চাহিদা যেমন– বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার খরচ কমাচ্ছে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ। নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন বেড়েই চলছে। যার ফলে জনসাধারণের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই যেন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় চাপের মুখে নাগরিক জীবন।
এছাড়া এখানকার বাতাস দূষিত, পানি দূষিত এবং মাটি দূষিত। এই পরিস্থিতিতে এদেশের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী টিকে থাকবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত অথবা অসুস্থ মধ্যবিত্ত নাগরিকদের দিয়ে কিছু করাতে চাইলে আগে তাদের সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মস্তিষ্ককে উদ্ভাবনী ও কৌশলী বানাতে হলে তাদের জন্য ভেজালমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের যোগান দিতে হবে।









