আহ্‌লান সাহ্‌লান মাহে রামাদান

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | শুক্রবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ইসলামের ৫টি স্তম্ভের মূল স্তম্ভ হচ্ছে সিয়াম বা রোজা। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কালামে পাকে উল্লেখ করছেন যে, ‘হে মানুষ তোমরা যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, আশা করা যায় যে, তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে’। সূরা বাকারা১৮৩। আল্লাহতায়ালা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যেন সিয়াম পালন করে। সিয়ামের উপকারিতা এই যে, এর ফলে পাপ ও কালিমা থেকে সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়। সিয়াম পালনের মাধ্যমে সিয়াম পালনকারীদের শরীরের পবিত্রতা লাভ হয় এবং শয়তানের পথে বাধা সৃষ্টি হয় । আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন যে, হে যুবকবৃন্দ! তোমাদের মধ্যে যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য রয়েছে সে বিয়ে করবে, আর যার সামর্থ্য নেই, সে সিয়াম পালন করবে। এটা তার জন্য রক্ষাকবচ হবে (ফাতহুল বারী, মুসলিম)। সহীহ বোখারী ও মুসলিম শরিফে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, পূর্বে আশুরার সিয়াম পালন করা হত। যখন রমজানের সিয়াম ফরজ করা হয় তখন আর আশুরার সিয়াম বাধ্যতামূলক থাকে না বরং যিনি ইচ্ছা করতেন, তিনি পালন করতেন এবং যিনি চাইতেন না, তিনি পালন করতেন না (ফাতহুল বারী, মুসলিম)। যারা সিয়াম পালন করতে পারে না যেমন: খুবই বয়স্ক, বৃদ্ধ এবং দুর্বল লোকযাদের সিয়াম পালন করার ক্ষমতা নেই, তারা সিয়াম পালন করবে না এবং তাদের ওপর সিয়াম ক্বাজা ও জরুরী নয়, কারণ তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই, ফলে ভবিষ্যতে তারা সিয়াম পালনে সক্ষম হবে না। এমতাবস্থায় তাদেরকে প্রতিটি ছুটে যাওয়া সিয়ামের জন্য ফিদ্‌ইয়া বা কাফ্‌ফারা আদায় করতে হবে। হযরত আনাস ইবন্‌ে মালিক (রাঃ) শেষ বয়সে অত্যন্ত বার্ধক্য অবস্থায় ২ বছর ধরে সিয়াম পালন করেননি এবং প্রতিটি সিয়ামের পরিবর্তে তিনি একজন মিসকিনকে গোস্ত রুটি আহার করাতেন (ফাতহুল বারী)। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজার মাসযাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এ (কুরআন হচ্ছে) মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎ পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী, অতএব তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি মাসটি পাবে, সে এতে রোজা রাখবে; যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তীতে গুণে গুণে সেই পরিমাণ দিন পূরণ করে নিবে; (এ সুযোগ দিয়ে) আল্লাহতায়ালা তোমাদের (কাজকর্মকে) আসান করে দিতে চান, আল্লাহতায়ালা কখনও তোমাদের (জীবনকে) কঠোর করে দিতে চান না। তোমরা যেন গুণে গুণে (রোজার) সংখ্যাগুলো পূরণ কর, আল্লাহতায়ালা তোমাদের (কুরআনের মাধ্যমে) যে পথ দেখিয়েছেন তার জন্য তোমরা তাঁর মাহাত্ন্য বর্ণনা কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় কর’সূরা বাকারা১৮৫। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সহীফা রমজান এর প্রথম রাতে, হযরত মুসা (আঃ) এর তাওরাত ৬ তারিখে, হযরত ঈসা (আঃ) এর ইঞ্জিল ১৩ তারিখে, এবং কুরআনুল করীম ২৪ তারিখে অবতীর্ণ হয় (আহমদ ৪/১০৭)। কুরআনুল করীমকে প্রথম আকাশের ওপরে রমজান মাসে কদরের রাতে অবতীর্ণ করা হয় এবং ঐ রাতকে বরকতময় রাতও বলা হয়। যেহেতু কোরআন এই মাসে অবতীর্ণ হয়েছে, অতএব এই মাসের মর্যাদাও অত্যধিক। কুরআন বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত এবং এই কুরআনেই রয়েছে প্রকাশ্য ও উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী। ভাবুক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এর মাধ্যমে সঠিক পথে পৌঁছাতে পারেন। এটা সত্য ও মিথ্যা, হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, রমজানের চন্দ্র উদয়নের সময় যে ব্যক্তি বাড়িতে অবস্থান করবে, মুসাফির হবে না এবং সুস্থ ও সবল থাকবে, তাকে বাধ্যতামূলক ভাবেই সিয়াম পালন করতে হবে। আল্লাহতায়ালা রুগ্ন ও মুসাফিরদের জন্য সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার অনুমতির কথা বর্ণনা করেন। এরা এ সময় সিয়াম পালন করবে না এবং পরে আদায় করে নিবে। যে ব্যক্তির শারীরিক কোন কষ্ট রয়েছে, যার ফলে তার পক্ষে সিয়াম পালন করা কষ্টকর হচ্ছে কিংবা সফরে রয়েছে সে সিয়াম ছেড়ে দিবে এবং এভাবে যে কয়টি সিয়াম ছুটে যাবে তা পরে আদায় করে নিবে। এর পরের আয়াতে আল্লাহতায়ালা বুঝাতে চাচ্ছেন, এরকম অবস্থায় সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়ে আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি বড়ই করুণা প্রদর্শন করেছেন। ইসলামের নির্দেশনাবলী সহজ করে দিয়ে তাঁর বান্দাদের কষ্ট হতে রক্ষা করেছেন। রাসূল (সাঃ) রমজানুল মোবারক মাসে মক্কা বিজয় অভিযানে সিয়াম পালন অবস্থায় রওয়ানা হোন। ‘কাদিদ’ নামক স্থানে পৌঁছে সিয়াম ছেড়ে দেন এবং সাহাবীগণকেও সিয়াম ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। (ফাতহুল বারী, মুসলিম)। রমজান মাসে সাহাবীগণও রাসূল (সাঃ) এর সাথে সফরে বের হতেন। তাদের কেহ কেহ সিয়াম পালন করতেন এবং কেহ কেহ সিয়াম পালন করতেন না। এমতাবস্থায় সিয়াম পালনকারীগণ বে সিয়াম পালনকারীদের উপর এবং সিয়াম না পালনকারীগণ সিয়াম পালনকারীদের উপর কোন দোষারোপ করতেন না। সুতরাং যদি সিয়াম ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব হতো তাহলে সিয়াম পালনকারীদেরকে অবশ্যই সিয়াম পালন করতে নিষেধ করা হত। এমনকি রাসূল (সাঃ) এর সফর অবস্থায় সিয়াম পালন করা সাব্যস্ত আছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফে উল্লেখ আছে, হযরত আবু দারদা (রাঃ) বর্ণণা করেন, রমজানুল মোবারক মাসে কঠিন গরমের দিন আমরা রাসূল (সাঃ) এর সাথে এক সফরে ছিলাম। কঠিন গরমের কারণে আমরা মাথায় হাত রেখে রেখে চলছিলাম। আমাদের মধ্যে রাসূল (সাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবন্‌ে রাওয়াহা (রাঃ) ছাড়া আর কেহ সিয়াম পালনকারী ছিলেন না। সফরে সিয়াম পালন করা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সিয়াম ত্যাগ করে সে উত্তম কাজ করে এবং যে ত্যাগ করে না তার কোন পাপ নেই’ (মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে রয়েছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের যে অবকাশ দিয়েছেন তোমরা তা গ্রহণ কর’ (মুসলিম শরীফ)। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হযরত হামজা ইবনে আমর আসলামী (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-আমি প্রায় সিয়াম পালন করে থাকি সুতরাং সফরেও কি আমার সিয়াম পালন করা অনুমতি রয়েছে? রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘ইচ্ছা হলে পালন কর, না হলে ছেড়ে দাও’ (ফাতহুল বারী)। হযরত যাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) একটি লোককে দেখেন যে, তাকে ছায়া করা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ব্যাপার কি? জনগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) লোকটি সিয়াম পালনকারী’ রাসূল (সাঃ) তখন বললেন, ‘সফরে সিয়াম পালন করা সওয়াবের কাজ নয়’ (ফাতহুল বারী, মুসলিম)। এখানে উল্লেখ্য যে, যে ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সফর অবস্থায় সিয়াম ছেড়ে দেওয়া মাকরুহ মনে করে, তার জন্য সিয়াম ছেড়ে দেওয়া জরুরী এবং সিয়াম পালন করা হারাম। ক্রমাগত সিয়াম পালন করা ওয়াজিব নয়। একসাথেও পালন করতে পারে আবার পৃথক পৃথকভাবে অর্থাৎ মাঝে মাঝে ছেড়ে ছেড়েও সিয়াম পালন করতে পারে। রমজান মাসে ক্রমাগতভাবে এজন্যই সিয়াম পালন করতে হয় যে, ওটা সমপূর্ণ সিয়ামের মাস আর রমজান মাস শেষ হওয়ার পর ওটা শুধুমাত্র গণনা করে পুরো করতে হয়, তা যে কোনদিনই হতে পারে। আল্লাহতায়ালা বান্দার কাজকর্মকে কঠিন করে দিতে চান না। বরং সহজ করে দিতে চান। আল্লাহতায়ালা বলছেন, তোমরা সহজ কর, কঠিন কর না এবং সুখবর দাও, ঘৃণার উদ্রেক কর না (আহমদ, ফাতহুলবারী, মুসলিম)। অতএব, আসুন আমরা এই রমজান মাসে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সিয়াম পালন করি এবং তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করি।

লেখক: সভাপতিরাউজান ক্লাব, সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল

পূর্ববর্তী নিবন্ধভাষার মাসে শুধু ভাষার চর্চা নয়
পরবর্তী নিবন্ধসোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মানসিক স্বাস্থ্যে বিপর্যয় ও থ্রি ‘এল’ থিওরি